অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনকারী রাজউকের ১৪ জন কর্মচারী-কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য হাতে পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখন চলছে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরির কাজ। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। দুদক ও রাজউক থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, হাইকোর্টের সুয়োমুটো রুল নম্বর-৮/২৩ এবং রুল নম্বর-১/২৩ এর নির্দেশ অনুযায়ী গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজউকের ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির উপপরিচালক মো. ইয়াছির আরাফাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- উপপরিচালক জেসমিন আক্তার ও মো. তানজিব হাসিব সরকার। দুদকের অনুসন্ধান টিম অভিযুক্ত ১৬ জনের ব্যক্তিগত ফাইল, তাদের সম্পদের হিসাবসহ অন্যান্য নথিপত্র সংগ্রহ করে। দুদকের অনুসন্ধান ও সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনা করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়।
যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় তারা হলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেক, হিসাবরক্ষক এ কে এম বায়েজিদ খান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিন, নকশাকার এমদাদ আলী, ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান, সার্ভেয়ার মাসুম বিল্লাহ, সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার, বেঞ্চ সহকারী বাসার শরীফ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ইউসুফ মিয়া, বেলাল হোসেন চৌধুরী রিপন, নকশাকার শহীদুল্লাহ বাবু (চলতি দায়িত্ব), উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসান, নকশাকার শেখ ফরিদ ও রেকর্ডকিপার মো. ফিরোজ।
এ বিষয়ে দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, রাজউকের কয়েকজন কর্মচারীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। শিগগিরই কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কমিশন। কম্পিউটার অপারেটর জাফর সাদেক : বিএনপিকে অর্থায়নের অভিযোগে গত বছরের ১৯ জানুয়ারি রাজউকের অফিস সহকারী জাফর সাদিককে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি রাজধানীর আফতাবনগরের ডি-ব্লকের ৫ নম্বর রোডে ২৯ নম্বর প্লটে সাড়ে ৩ কাঠা জমিতে নূর আহমেদ ভিলা নামে আটতলা এবং ৩৩ শান্তিনগরে একটি ফ্ল্যাট থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি চাকরির পাশাপাশি রাজউকের প্লট বেচাকেনার মধ্যস্থতা, নকশা পাস করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পাওয়া ঘুষের টাকায় এসব সম্পদ গড়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন।
হিসাবরক্ষক বায়েজিদ খান :
রাজউকের উত্তরা জোনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে টানা ১১ বছর দায়িত্ব পালন করেন বায়েজিদ খান। উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর সড়কে তিন কাঠার ৫ নম্বর প্লটে ছয়তলা বাড়ি আছে তার। এর বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। এছাড়া উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ২০ এবং ২২ নম্বর প্লট দুটির মালিক তিনি। একেকটি প্লটের দাম প্রায় ৬ কোটি টাকা। ১২ কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লট একত্র করে তার ওপর নয়তলা ভবন নির্মাণকাজ চলছে। প্রতি তলায় চারটি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ভবন নির্মাণে আনুমানিক খরচ হবে প্রায় ১২ কোটি টাকা।
ডাটা এন্ট্রি অপারেটর আবদুল মোমিন :
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে তিনি ২৮ হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাকরি করেন। মুগদার দক্ষিণ মা-ার ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর প্লটে প্রায় ৫ কাঠা জমিতে সাততলা বাড়ি আছে তার। যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এছাড়া মতিঝিলের ১০ কবি জসীম উদ্দীন রোডে তার দুটি ফ্ল্যাট আছে। নক্সীকাঁথার মাঠ নামে নয়তলা ভবনের ১ হাজার ৭২৫ বর্গফুটের তার ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য ২ কোটি টাকা, যার নম্বর বি-৬। এ বাসায় থাকেন মোমিন। সাভারের ভাদাইল এলাকায় পুরনো ইপিজেড সংলগ্ন হোসেন প্লাজার পাশে ২ বিঘা জমি কিনে টিনশেড তুলে পোশাককর্মীদের ভাড়া দিয়েছেন তিনি। যার বাজারদর অন্তত ৫ কোটি টাকা। এছাড়া পূর্বাচলে স্ত্রীর নামে একটি প্লট আছে।
নকশাকার এমদাদ আলী :
সম্প্রতি রেখাকার থেকে পদোন্নতি পেয়ে এমদাদ আলী নকশাকার হয়েছেন। ২৪ হাজার টাকা বেতনের চাকরি হলেও তার বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে ৫ কাঠা জমিতে ছয়তলা বাড়ি আছে। এছাড়া ডেমরায় এমদাদ আলীর আরও দুটি ৭ কাঠার প্লট আছে।
ইমারত পরিদর্শক মনিরুজ্জামান :
তার চাকরির বয়স প্রায় ৪ বছর। তিনি সম্প্রতি দক্ষিণ পীরেরবাগের আমতলা টাওয়ারে ২ কোটি টাকায় ১ হাজার ৬৩০ বর্গফুটের ই-৬ নম্বর ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। এছাড়া জি প্রিমিও ব্র্যান্ডের গাড়িও (ঢাকা মেট্রো-গ ৩৬-৩৩০৪) কিনেছেন তিনি।
সার্ভেয়ার মাসুম বিল্লাহ :
উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর প্লটে সাততলা বাড়ি আছে তার। বাড়িটির বর্তমান বাজারদর অন্তত ১০ কোটি টাকা।
এছাড়া সুপারভাইজার খালেদ মোশাররফ তালুকদার রুবেলের বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ৭ কাঠা জমিতে পাঁচতলা বাড়ি আছে। ঢাকার মাদারটেকে আছে নিজের ফ্ল্যাট। রয়েছে করোলা ফিল্ডার গাড়িও। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরেও মার্কেট রয়েছে।
অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে রাজউক শ্রমিক লীগের সভাপতি বেঞ্চ সহকারী বাশার শরীফ নথি গায়েব করে বাণিজ্য করার অভিযোগে গত বছরের ২৫ আগস্ট চাকরি হারান। ঢাকার মানিকনগর পুকুরপাড়ে তার ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও টয়োটা নোয়া গাড়ি (নম্বর ঢাকা মেট্রো-ছ ১৯-০৪১৪) রয়েছে। রাজউকের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ইউসুফ মিয়া ঢাকায় বাড়ি না করলেও গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মিঠানগর ইউনিয়নের মলিহাস গ্রামে করেছেন তিনতলা বড় বাড়ি। আছে শ’খানেক গরুর দুটি খামার।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর বেলাল হোসেন চৌধুরী পল্টনের ৬৬ শান্তিনগর হোল্ডিংয়ের সি-৫ নম্বর ফ্ল্যাটের মালিক।
মিরপুরের পীরেরবাগে নকশাকার শহীদউল্লাহ বাবুর রয়েছে একটি বাড়ি। তার একটি গাড়িও আছে। উচ্চমান সহকারী মোহাম্মদ হাসানের বাড্ডায় একটি ছয়তলা বাড়ি ও আফতাবনগরে প্লট রয়েছে। রেকর্ডকিপার মো. ফিরোজের উত্তরা মডেল টাউনের ১২ নম্বর সেক্টরে ছয়তলা বাড়ি রয়েছে।

See insights and ads
Boost post
Like
Comment
Share











