একদিকে দুর্নীতির তদন্ত অন্যদিকে ৭ম বারের মত নিয়োগ: শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে লিয়াকত আলী লাকী অপরিহার্য কেন?
দেশের সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের অবাক করে দিয়ে ৭ম বারের মতো (১৪ বছর) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে পুন: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকীকে। অথচ: তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচারে শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দেশে এতো এতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থাকতে লিয়াকত আলী লাকীকে কেন বার বার শিল্পকলার ডিজি পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তার কোন কারণ খুজে পাচ্ছেন না সুশীল সমাজ। তাইতো সবার মনেই একটা বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, লাকীর খুঁটির জোর কোথায়? যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির এতা বড় অভিযোগ দুদকের তদন্তাধীন রয়েছে তাকে কেন আবার ৭ম বারের মতো নিয়োগ দেওয়ার প্রযোজন পড়লো? এ বিষয়ে নানা কথা আলোচনা চলছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। উল্লেখ্য যে ৭ম বারের মতো তার চুক্তির মেয়াদ দুই বছরের জন্য বাড়িয়েছে সরকার। বুধবার (২৯ মার্চ) এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) প্রবিধানমালা, ১৯৯২-এর বিধি ৩ (ঘ) অনুযায়ী বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লিয়াকত আলী লাকীকে তার বর্তমান চুক্তির ধারাবাহিকতায় ও অনুরূপ শর্তে আগামী ১৩ এপ্রিল ২০২৩ অথবা যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী ২ (দুই) বছর মেয়াদে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর মহাপরিচালক পদে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হলো।
২০১১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে লিয়াকত আলী লাকী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর টানা ৬ বার এই পদে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। বলা যায়, প্রায় এক যুগ ধরে তিনি শিল্পকলার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তার বিরুদ্ধে দুদকে যে অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে তার বর্ণনায় জানা যায়- শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া বিলসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন। ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন লাকী সিন্ডিকেটের ৮ কর্মকর্তা। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২ সদস্যের টিম করেছে দুদক। এ বিষয়ে দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক খান বলেন, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা অর্থের একটি বড় অংশ পাচারের তথ্যও পেয়েছে দুদক। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোজাম্মেল হক আরও বলেন, দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়ার সমন্বয়ে অনুসন্ধান টিম করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিমের তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে আছেন পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়, লিয়াকত আলী লাকী প্রায় একযুগ ধরে শিল্পকলা একাডেমির ডিজির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তিনি গত বছরের ৩০ জুন বিভিন্ন ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরের ৩০ জুন একজন সচিবকে দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তাকে এই কাজে সহায়তা করেন দুজন কালচার অফিসার সহকারী পরিচালক (হিসাব) আল হেলাল ও উপপরিচালক (অর্থ) শফিকুল ইসলাম।
গত বছরের ৩০ জুন ৮ জন কালচার অফিসারকে জেলায় বদলি করে মন্ত্রণালয়। ডিজি প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করে তাদের বদলির আদেশ বাতিল করান। এর পর এসব কর্মকর্তাকে নিয়ে মিটিং করে অনুষ্ঠান দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তিনি বিভিন্ন জেলার কালচার অফিসারদের ঢাকায় এনে সুযোগসুবিধা দিয়ে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। একই সঙ্গে তার সিন্ডিকেটের ৮ জন জেলা কালচার অফিসার বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এসব অফিসারের মধ্যে চাকলাদার মাসুদ সুমন ১০ কোটি টাকা, এরশাদ হাসান ৫ কোটি টাকা, সুজন মাহবুব ৫ কোটি টাকা, মোস্তাক আহমেদ ১০ কোটি এবং ৫টি মাইক্রোবাস, রাকিবিল বারী ৫ কোটি, রিফাত জাহান ৫ কোটি, আল হেলাল ১০ কোটি ও শহিদুল ইসলাম ১০ কোটি টাকা অর্জন করেন। অভিযোগে বলা হয়, করোনার কারণে এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী হয়নি। কিন্তু ১২-১৫ কোটি বাজেট লোপাটের জন্য ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান করে কাগজপত্র বানানো হয়। যারা চারুকলার কাজ বোঝেন, তাদের এর সঙ্গে রাখা হয়নি। তিনি অর্থ লোপাটের উদ্দেশ্যে নিজের পছন্দের লোক দিয়ে চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজনে জোট বাঁধেন। ২০২০-২১ অর্থবছরের শিল্পকলা একাডেমির অব্যয়িত ৩৫ কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অর্থ আত্মসাতের পথ সুগম করতে তিনি একাডেমি সচিবকে জুন মাসে সরিয়ে দিয়ে অন্য একজনকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিবছর জুন মাসে ২৫-৩০ কোটি টাকা লোপাট করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২১ সালের ৩০ জুন শিল্পকলা একাডেমির আগের সচিব নওশাদ হোসেন বদলি হলে ওইদিনই নতুন আদেশ জারি করে একাডেমির চুক্তিভিত্তিক পরিচালক সৈয়দা মাহবুবা করিমকে সচিবের দায়িত্ব দেন লাকী। এর পর ৩০ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে ২৬ কোটি টাকা ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে করে আত্মসাৎ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংগীত বিভাগের কক্ষে ব্যবহারের জন্য পর্দা, ক্রোকারিজ ও আসবাব না কিনে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ বরাদ্দ, ডান্স এগেইনস্ট করোনা কর্মসূচির আওতায় নৃত্যদলের সম্মানী, হার্ডডিস্ক ক্রয়, ডকুমেন্টেশন, প্রপস-কস্টিউম, প্রচার ও বিবিধ ব্যয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।
২ বছরের ব্যয়ের সব নথি তলব
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির দুই অর্থবছরের বাজেট ও ব্যয় সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র তলব করে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (৫ জানুয়ারি) সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সই করা চিঠিতে এসব নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো চিঠিতে যেসব রেকর্ডপত্র তলব করা হয়েছে, সেসবের মধ্যে রয়েছে, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে শিল্পকলার ঢাকা কার্যালয়ে বরাদ্দকৃত বাজেট ও ব্যয়সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংবলিত নথির ফটোকপি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে অব্যয়িত ৩৫ কোটি টাকা ২০২১ সালের ৩০ জুনে ব্যয়করণ-সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র।
এছাড়াও রয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সংবলিত নথির ফটোকপি, ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত ব্যয় সংক্রান্ত বিভিন্ন ভাউচার-ক্যাশ বই এবং শিল্পকলা একাডেমি নামীয় সোনালী ব্যাংক (সেগুনবাগিচা শাখা) অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টের কপি।
এ ধরনের গুরুতর একটি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে তদন্ত চলমান থাকাকালে কিভাবে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফের আবার মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলো সেটা এখন গোটা দেশবাসীর প্রশ্ন।











