০৬:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একহাত পনের শত দুইহাত ডিসকাউন্টে পঁচিশ শত: ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে সেবা পেতে পদে পদে ঘুস!

প্রতিনিধির নাম:

ঘুসের রেট
…………………………….
ট্রলিম্যান-২০০/৩০০ টাকা।
খালা বা আয়া-২০০/৩০০ টাকা।
ওয়ার্ডবয়-২০০/৩০০ টাকা।
প্লাস্টার ও ব্যান্ডেজম্যান (জরুরী বিভাগ) ২/৩ হাজার টাকা।
প্লাস্টার ইনডোর-৫০০/৬০০ টাকা।
এক্সরেম্যান- ১/২ শত টাকা।
ড্রেসিংম্যান-১/২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া সরকারী ফি-তো রয়েছেই।
………………………………

বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের ইটেও ঘুস খায়। ঘুস ছাড়া কোন সেবা কল্পনাও করা যায় না এই সরকারী হাসপাতালটিতে। জরুরী বিভাগ থেকে শুরু করে অপরারেশন বিভাগ,এক্সরে বিভাগ এবং বর্হি:বিভাগে ওপেন সিক্রেট ঘুস নেওয়া হলেও তা নজরে পড়ে না হাসপাতাল পরিচলকের। এ অভিযোগ রোগীর অভিভাবকদের। টাকা ছাড়া ড্রেসিং এবং প্লাস্টারের কাজ করেন না হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়, ও আয়ারা।
২৬ এপ্রিল ২০২৩ ভোর ৪ টায় মাগুরা থেকে জরুরী বিভাগে হাত ভাঙা অবস্থায় চিকিতসা নিতে আসেন বাপ ও মেয়ে। জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তার তাদের পরীক্ষা নীরিক্ষা করে প্লাস্টার ব্যান্ডেজ করার নির্দেশ দেন। এই প্লাস্টার ব্যান্ডেজ করার জন্য ডিউটিরত ২ কর্মচারি ৩ হাজার টাকা দাবী করেন। বলেন, হাসপাতালে গ্যাজ ব্যান্ডেজ সাপ্লায় নেই। বাইরে থিকে কিনে আনুন। ভোর ৪ টার সময় দোকানপাট বন্ধ থাকায় অসহায় হয়ে পড়েন রোগীর অভিভাবকরা। এ দিকে ব্যাথায় কাতর দুই রোগীর আহাজারির কারণে অভিভাবকরা দিশাহারা। তারা দরদাম করতে থাকেন, এ সময় বলা হয় ১ হাত করলে ১৫ শত টাকা,২ হাত করলে ডিসকাউন্টে একদাম ২৫ শত টাকা। এর এক টাকা কমেও হবে না। অত:পর অনেক অনুনয় বিনয় করে ২৫ শত টাকা ঘুস দিলে তবেই সরকারী গ্যাজ,ব্যান্ডেজ ও চকপাউডার দ্বারা কোন প্রকার দায়সারাগোছে ২ রোগীর হাতে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়।
আমগাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙে যায় ১০ বছরের একটি শিশুর। ড্রেসিং করতে এক দিন পরপর যাত্রাবাড়ী থেকে শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) আসতে হয় তাকে। বিনা মূল্যে ড্রেসিং সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও শিশুটির পরিবারকে প্রতিবার ২০০ টাকা করে খরচ করতে হয়।
পঙ্গু হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সব রোগীকে পদে পদে টাকা গুনতে হয়। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মূলত হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়াদের বিরুদ্ধে। সেবা গ্রহীতারা বলেন, যেসব সেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা, অর্থ খরচ না করলে এর সামান্যটুকুও মেলে না।
সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়রা একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় এমনটা হচ্ছে বলে অভিযোগ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার।
২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ৭টি এবং কেবিন রয়েছে ১০টি। এছাড়াও ১টি ভি.আই.পি কেবিন ও ১০টি ফ্রি বেড রয়েছে। কেবিনের ভাড়া ১,০০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত এবং ওয়ার্র্ডের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এসি ও নন এসি ওয়ার্ড ও কেবিনের মান অনুসারে ভাড়ার পার্থক্য হয়। কেবিন/ওয়ার্ডে সিট পাওয়ার জন্য জরুরী বিভাগে যোগাযোগ করতে হয়। এখান থেকে ডাক্তার রোগীকে ভর্র্তির পরামর্শ দিলে বেড খালি খাকা সাপেক্ষে রোগী ভর্তি করা হয়। তবে জরুরি হলে মেঝেতে চাদর বিছিয়েও রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
গতকাল সোমবার হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, যেসব রোগী ড্রেসিং করেছেন, প্লাস্টার করেছেন তাঁদের প্রায় সবাইকে এ জন্য টাকা খরচ করতে হয়েছে। ড্রেসিংয়ের জন্য ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত রোগীর কাছ থেকে নিতে দেখা গেছে। আর প্লাস্টারের ধরনের ওপর নির্র্ভর করে টাকার পরিমাণ। তবে সে ক্ষেত্রেও ৪০০ টাকার কম নয়।
সিঁড়ি থেকে পড়ে পায়ে আঘাত পেয়ে মিরপুরের কালশী থেকে হাসপাতালে এসেছেন এক নারী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে প্লাস্টারের জন্য প্লাস্টার কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত নার্স এই সেবার জন্য তাঁর কাছে ৬০০ টাকা চান। তবে ওই নারীর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকায় রফা হয়।
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক মাহফুজুল হক তালুকদার বলেন, পঙ্গু হাসপাতালে সব সেবাই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কেবল এক্স-রে, প্যাথোলজি এবং ফিজিওথেরাপির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ড্রেসিং ও প্লাস্টারের কাজটি মূলত সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দায়িত্ব। তবে সেখানে আয়া-ওয়ার্ড বয় এমনকি সুইপারকেও কাজ করতে দেখা যায়। গতকাল ড্রেসিংয়ের কক্ষে ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স মান্নান ও মঞ্জুরুল। আর প্লাস্টার কক্ষে দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র স্টাফ নার্স বাসারুল আলম, মোতালেব হোসেন ও এম এ কাইয়ুম। তাঁরা সবাই দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। এর মধ্যে এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়া এবং রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ বেশি।
এম এ কাইয়ুম বলেন, ‘হাসপাতালে দীর্ঘদিন থেকে প্লাস্টারের সাপ্লাই নাই। আমরা রোগীদের হেল্পটেল্প কইরা ব্যবস্থা কইরা দিই। তাদের কেউ খুশি হইয়া, কেউ জোর করে পকেটে ১০০-২০০ টাকা ঢুকাইয়া দেয়।’ হাসপাতালের নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি কাইয়ুম বলেন, ‘প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে বয়দের এখানে কাজ করতে পাঠান। এতে বাধা দেওয়ায় তাঁদের আমার ওপর ক্ষোভ।’
পুরোনো রোগীদের রেকর্ড রুমে গিয়ে নাম নিবন্ধন করে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে হয়। এতে কোনো টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও সেখানে রোগীপ্রতি ২০ টাকা করে নেয়। গতকাল সেখানে মহিউদ্দিন নামের ওয়ার্ড বয়কে টাকা নিতে দেখা গেছে। এখানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা কাজ করার কথা থাকলেও লোকবল না থাকায় দুজন ওয়ার্ড বয় দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে হাসপাতালের এক উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন বদলি না হওয়ায় সিনিয়র স্টাফ নার্স, আয়া ও ওয়ার্ড বয়দের দুর্নীতির সুযোগ অনেক বেড়েছে। এই স্টাফ নার্সদের কাছে রোগী এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনও অসহায়। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি হাসপাতালের সবাই অবগত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল গনি মোল্লাহ বলেন, বহির্বিভাগে রোগীর তুলনায় জায়গা খুব কম। এই সুযোগে কেউ হয়তো কিছু অনিয়ম করছে। যাচাই-বাছাই করে তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জরুরী বিভাগের ওটিতে টাকার খেলা
জরুরী বিভাগের পাশেই নীচতলায় বর্হিবিভাগেন অপারেশন থিয়েটার বা ওটি। এখানে চলছে এলাহী কান্ড। রোগীর অভিভাবকদের ব্ল্যাকমেল করে দফায় দফায় টাকা,ওষুধ, স্যালাইন, সেলাই করার সুতা এমন কি গ্যাজ, ব্যান্ডেজ পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে ওয়ার্ডবয় , নার্স ও বহিরাগত দালালরা। রোগীদের অপারেশন থিয়েটার বা ওটিতে ঢুকানোর পর ঘন্টায় ঘন্টায় একেকজন ওযার্ডবয়,নার্স বা বহিরাগত এসে অভিভাবকদের কাছে একেকজন একেক রকম ওষুধের স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এটা এখনি নিয়ে আসুন আপনার রোগীর লাগবে। ডাক্তার স্যার লিখে দিয়েছেন। এভাবে রোগীর অভিবাবকদের ব্ল্যাকমেলিং করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে টাউট শ্রেণী। অথচ: এদের উতখাত করার কোন পদক্ষেপই নিচ্ছেন না হাসপাতাল প্রশাসন। অন্য দিকে ওটি থেকে রোগী বের করে এনে অ্জারভেশন ওয়ার্ডে রাখতেও দিতে হচ্ছে বখশিস। ৪/৫ শত টাকা বখশিস ন্ দিলে তারা ওটি থেকে রোগী বেন কনছে না। আবার অবজারভেশন ওয়ার্ড থেকে রোগীতে বেডে স্থানান্তর করতে গেলেও ওয়ার্ডবয় বা আয়াদের দিতে হচ্ছে ২/৩ শত টাকা। রোগীকে ৭/৮ তলায় ওয়ার্ডে স্থানান্তর করতে গেলেও ট্রলিম্যানদের দিতে হচ্ছে ২/৩ শত টাকা। ভর্তি রোগীদের বেড পেতেও গুনতে হচ্ছে ৫শত থেকে ১ হাজার টাকা। না হলে বেড মিণছে না। বেশির ভাগ রোগীই তাই ফ্লোরে পাটি বিছিয়ে অমানবিক দিনরাত কাটাচ্ছেন। এখাবে থাকতে যেয়ে অনেক রোগীর অভিভাবক আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ডাক্তারদের অমানবিক ঘুসকান্ড!
এই হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের কিছু স্ার্জন ও সহযোগী সার্জন রোগীদের ওপর মড়ার ওপর খাড়ার ঘা দিচ্ছেন নিয়মিত। তারা সরকারী বেতন ভাতা পেলেও ঘুস ছাড়া কোন রোগীকে অপারেশন করেন না। আর এই ঘুস নেওয়ার পদ্ধতিটাও একদম ভিন্ন। যেহেতু কারা সরাসরি ঘুস নিতে পারছেন না,তাই একটু বাকা পথ অবলম্বন করছেন। যেমন: অপারেশন করার আগে রোগীর অভিভাবকদের হাতে সার্জিক্যলি ইন্সট্রুমেন্টের তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি কোন দোকান থেকে কিনতে হবে সেটিও লিখে দিচ্ছেন। ফলে ওই দোকানদার ১ টাকার মাল ৩ টাকা হারে বিল কষে নিছেন। পরবর্তীতে অতি: নেওয়া ২ টাকা সার্জন কমিশন বাবদ নিজের পকেটে তুলছেন। এছাড়াও অপারেশন চলাকালে সার্জনের একান্ত লোক কাছে রেখে নানা অজুহাত দেখিয়ে ৫/৬ হাজার টাকা আদায় করছেন। এই টাকার কোন রশিদ বা ভাউচারও দিচ্ছেন না।

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পঙ্গু হাসপাতাল
তিন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল। তারা রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে হাসপাতালে নানা ধরনের অপকর্ম চালায়। এক্স-রে, সিটিস্ক্যান, এমআরআই নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত এই সিন্ডিকেট।
কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করেনি। উল্টো তাদেরই হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শ করে নিজেদের অপকর্ম চালিয়ে যেত। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া এই তিনজনকে শাস্তিমূলক বদলি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু তারা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে বদলির ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে। ফলে হাসপাতালে এখন তাদের প্রভাবই বহাল। আগের চেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের তিনজন টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পায় কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। তারপর হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ডা. তড়িৎ কুমার সাহাকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাদের শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। সেখানে বলা হয়- জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) মো. হুমায়ুন কবির, মো. হেলালুল মোজাম্মেল ও মো. আবদুল বারেককে যথাক্রমে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু যোগদানের তারিখ শেষ হওয়ার আগেই সিন্ডিকেটের এ তিন সদস্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে বদলির ওপর স্থগিতাদেশ এনে জমা দেন।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গনি মোল্লা বলেন, সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ তিনজন দীর্ঘদিন নানা অপকর্ম করে আসছে। তদন্তে সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাদের বদলি করা হল। কিন্তু প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে এ অপরাধীরা স্থগিতাদেশ পেয়েছে। এখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটির সদস্য এবং হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাকসুদা বেগম ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম তাদের মতামত প্রদান করেন। যেখানে এ তিন টেকনোলজিস্টের ভয়ংকর চরিত্র উন্মোচিত হয়। তারা বলেন, গত ১০ বছরে হুমায়ুন কবির সম্পর্কে রোগীদের কাছ থেকে অনেক অভিযোগ এসেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে এক্স-রে করার বিনিময়ে সরকারি ফি’র বাইরে রোগীপ্রতি অতিরিক্ত ১০০-২০০ টাকা আদায় এবং রোগীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি।

একপর্যায়ে হুমায়ুন কবির সিটিস্ক্যান করার দাবি জানালে তাকে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে বিনা রশিদে রোগীদের সিটিস্ক্যান শুরু করে। এ অপরাধে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে হুমায়ুনের দুর্নীতি প্রমাণের জন্য হাসপাতাল পরিচালকের মৌখিক নির্দেশে ইমার্জেন্সি এক্স-রে রুমে দুটি অনলাইন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। কিন্তু এতে হুমায়ুন ক্ষুব্ধ হন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। রাতে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে রাখেন। এমনকি বিভাগীয় প্রধানের নির্দেশ অমান্য করে বহিরাগতদের দিয়ে হাসপাতালে ডিউটি করাতে থাকেন। যারা রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে তাকে সাহায্য করে। তিনি বিভাগীয় প্রধানের কোনো নির্দেশ মানতেন না, ঠিকমতো ডিউটি রোস্টার না মেনে নিজের মর্জিমাফিক কাজ করতেন। কোনো অনিয়মে বাধা দিলেই কটূক্তি করতেন। এমনকি নানা হুমকি দিতেন। ডিউটিতে থাকাবস্থায় হাসপাতালে থেকেই নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এমনকি মদ্যপ অবস্থায় হাসপাতালে চলাফেরা করতেন এবং সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন।

হেলাল মোজাদ্দেদ সম্পর্কে তদন্ত কমিটি বলেন, হেলাল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে কর্মরত ছিলেন। সেখানে এক্স-রে, সিটিস্ক্যান ও এমআরআই বন্ধ থাকায় এবং হুমায়ুন কবিরের আত্মীয় হওয়ায় নিটোরে নবসৃষ্ট পদে বদলি হয়ে আসেন। সিটিস্ক্যান, এমআরআই রোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন না। সিটিস্ক্যান ও এমআরআই রোগীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতেন। এসব অনৈতিক কাজে হাসপাতালের বাইরের লোক ব্যবহার করতেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়াই তাদের কথোপকথন রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেইল করতেন। বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তর ছবি তুলে হাসপাতালে বাইরের লোকজনের কাছে পাচার করতেন। এমনকি কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে তাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতেন।
আব্দুল বারেক সম্পর্কে তদন্ত কমিটির বক্তব্য-বারেক এক্স-রে ও সিটিস্ক্যান করে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন- এটা তিনি নিজেই বহুবার স্বীকার করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, কারও নির্দেশনাই মানতেন না। এমনকি কোভিড-১৯ নির্ধারিত হাসপাতালে তাকে প্রেষণে পাঠানো হলেও কোয়ারেন্টিন সময়ে অধিপত্য বজায় রাখতে এই বিভাগে আসতেন।
তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া তথ্যে দেখা যায়, মো. হুমায়ুন কবির পঙ্গু হাসপাতালে যোগদান করেছেন ২০০৮ সালে, আবদুল বারেক ২০০৩ সালে এবং মো. হেলালুল মোজাদ্দেদ যোগদান করেছেন চলতি বছরের শুরুর দিকে। এই তিনজনই দাবি করেছেন তারা এমআরআই এবং সিটিস্ক্যান করেন না, তাই রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি তারা এক্স-রে করেও রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তারা হাসপাতালে বাইরের লোক দিয়ে কাজ করোনার কথা স্বীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম বলেন, তদন্তে তিনজন টেকনোলজিস্টের অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিদফতর থেকে তাদের বদলি করা হয়েছে। কিন্তু তারা বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান না করে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে স্থগিতাদেশ এনেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের স্থগিতাদেশ বলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এমনকি এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়। হাসান ইমাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালক, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত অর্ধশত চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। তারা সবাই বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করেছেন; কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কোনো নির্দেশ দিলেই তারা আদেশ অমান্য করে। এতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বিনষ্ট হয়।
বহিরাগত দালালদের অসীম দৌরাত্ম
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) এখনো বহিরাগত দালালদের হাতে জিম্মি বলে দাবি করেছেন রোগীরা। সাধারন রোগীদের অভিযোগ, যেকোনো রিপোর্ট করতে গেলে দালালরা বিভিন্নভাবে বিরক্ত করে।
রোগীদের অভিযোগ, দালালরা জানায় পঙ্গু হাসপাতালের টেস্ট রিপোর্ট ভালো হয় না। এজন্য তারা আশেপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে টানাটানি করে। এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর সঙ্গে থাকা লোকজন যদি সতর্ক হয়, তাহলে দালালদের খপ্পর থেকে কিছুটা রেহাই পাবেন তারা।
রোগীদের অভিযোগ, জরুরি ও বহির্বিভাগের গেট থেকেই ভর্তি পর্যন্ত শুরু হয় রোগীদের ভোগানিাত। রবিবার (২৮ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে ঘুরে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ সময় আজগর আলী নামের এক রোগী বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে একটি ভবনের ছাদ থেকে পড়ে হাত ভেঙে যায়। এরপর এখানে ডা. শাহিন সুলতানাকে দেখাই। আমার হাত ঠিক হতে তিনি আমাকে ৬ মাস সময় বেধে দেন। আমি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। পরে ডা. রিয়াজের সহকারীর খপ্পরে পড়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পঙ্গু থেকে ছাড়পত্র নিই। আমি পরে বুঝতে পারলাম প্রতারণার শিকার হয়েছি। এরপর আমি আবার ডা. শাহিন সুলতানাকে দেখাই এবং বর্তমান ভালো আছি।’
মটরসাইকেলে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গাজিপুর জেলার কাশিমপুর এলাকা থেকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসছেন সাগর হোসেন। এ সময় সাগর হোসেনের বাবা বিপুল আলী বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে আসার সময় গেটের বাইরে থেকে রাজু নামের এক দালাল আমাদের বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী নিয়ে যেতে, আমরা বলেছি পঙ্গু হাসপাতালেই রোগীর চিকিৎসা করব।’
মহাখালী সাততলা বস্তি থেকে রফিক নামের এক ব্যক্তি রোগী নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, দালাল-সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি পঙ্গু হাসপাতাল, দেখার কেউ নেই। এখানে স্টাফরা রোগীদের সহযোগিতা করে না।’
এ সময় শ্যামপুরের তাসলিমা নামের এক নারী অভিযোগ করে বলেন, রোগী ভর্ভির সময় নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ধাপে ধাপে টাকা দিতে হয় অন্যথায় স্টাফ বা ট্রলিম্যানরা রোগী ধরতে চায় না।
ফরিদপুর থেকে রোগী নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ফাতেমা বেগম নামের আরেক নারী। তিনি অভিযোগ করেন, রোগীর প্রয়োজনে সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না ডাক্তার, নার্স, ওষুধসহ সব কিছুই বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। প্রাইভেট হাসপাতালের মতো পঙ্গু হাসপাতাল। তার মধ্যে তো আছেই দালালদের দৌরাত্ম্য।
তিনি বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল) যেন এখনো দালাল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।’
জানা যায়, বখশিশ ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না পঙ্গু হাসপাতালে। চিকিৎসা সেবা প্রদানের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চরম ভোগাস্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে কেবিন, ওয়ার্ড, প্যাথলজি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটারসহ বহির্বিভাগ পর্যন্ত এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পঙ্গু হাসপাতালে টাকা ছাড়া কোনো রোগী ওয়ার্ডবয় ও আয়াদের কাছ থেকে ন্যূনতম সেবা পান না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সিন্ডিকেটের কাছে ডাক্তাররা পর্যন্ত অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। হাসপাতালের একাধিক নার্স ও ওয়ার্ডবয় জানিয়েছেন, দালালদের আগে দেখলে চেনা যেত। বর্তমানে তারা সিন্ডিকেটের যোগসাজশে দর্শনার্থীদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে, দেখলে চেনার কোনো উপায় নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালকের সহকারী মোহাম্মাদ জাহিদ ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, সিন্ডিকেটের চোখের ইশারায় রোগীদের টার্গেট করে। যেসব রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বহন করার সামর্থ্য আছে সেসব রোগী এবং তাদের স্বজনদের কাছে গিয়ে দালালরা পঙ্গু হাসপাতাল সম্পর্কে বিভিন্ন খারাপ ধারণা দিতে থাকে। তারা ওই সব রোগীদের অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। সবাই সর্তক হলে এসব কমে আসবে। আমাদের সেবার মান বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল গনি মোল্লাহ বলেন, ‘আগের মতো এখন আর পঙ্গু হাসপাতালে দালাল চক্রের সদস্যরা রোগীদের বিরক্ত করতে পারে না। আমরা পরিচ্ছন্ন পঙ্গু হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে কিছু কিছু সময় রোগীদের ভুলের কারণে তারা ভাঙা হাত-পা দ্রত ভালো করার আশার দালালের খপ্পরে পড়ে, ও অন্য প্রইভেট হাসপাতালে চলে যায়। পরে তারা বিভিন্ন ভোগান্তির শিকার হয় এবং পঙ্গু হাসপাতালের দোষ দেয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের মানুষ ঘোরাঘুরি করে। দেশের প্রতিটা সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, রোগীরা যদি এসব বিষয়ে একটু সর্তক হয় তাহলে দালালের খপ্পড়ে থেকে তারা দূরে থাকবে।’

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:৫২:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ মে ২০২৩
১২২৫ বার পড়া হয়েছে

একহাত পনের শত দুইহাত ডিসকাউন্টে পঁচিশ শত: ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে সেবা পেতে পদে পদে ঘুস!

আপডেট সময় ১০:৫২:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ মে ২০২৩

ঘুসের রেট
…………………………….
ট্রলিম্যান-২০০/৩০০ টাকা।
খালা বা আয়া-২০০/৩০০ টাকা।
ওয়ার্ডবয়-২০০/৩০০ টাকা।
প্লাস্টার ও ব্যান্ডেজম্যান (জরুরী বিভাগ) ২/৩ হাজার টাকা।
প্লাস্টার ইনডোর-৫০০/৬০০ টাকা।
এক্সরেম্যান- ১/২ শত টাকা।
ড্রেসিংম্যান-১/২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া সরকারী ফি-তো রয়েছেই।
………………………………

বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের ইটেও ঘুস খায়। ঘুস ছাড়া কোন সেবা কল্পনাও করা যায় না এই সরকারী হাসপাতালটিতে। জরুরী বিভাগ থেকে শুরু করে অপরারেশন বিভাগ,এক্সরে বিভাগ এবং বর্হি:বিভাগে ওপেন সিক্রেট ঘুস নেওয়া হলেও তা নজরে পড়ে না হাসপাতাল পরিচলকের। এ অভিযোগ রোগীর অভিভাবকদের। টাকা ছাড়া ড্রেসিং এবং প্লাস্টারের কাজ করেন না হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়, ও আয়ারা।
২৬ এপ্রিল ২০২৩ ভোর ৪ টায় মাগুরা থেকে জরুরী বিভাগে হাত ভাঙা অবস্থায় চিকিতসা নিতে আসেন বাপ ও মেয়ে। জরুরী বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তার তাদের পরীক্ষা নীরিক্ষা করে প্লাস্টার ব্যান্ডেজ করার নির্দেশ দেন। এই প্লাস্টার ব্যান্ডেজ করার জন্য ডিউটিরত ২ কর্মচারি ৩ হাজার টাকা দাবী করেন। বলেন, হাসপাতালে গ্যাজ ব্যান্ডেজ সাপ্লায় নেই। বাইরে থিকে কিনে আনুন। ভোর ৪ টার সময় দোকানপাট বন্ধ থাকায় অসহায় হয়ে পড়েন রোগীর অভিভাবকরা। এ দিকে ব্যাথায় কাতর দুই রোগীর আহাজারির কারণে অভিভাবকরা দিশাহারা। তারা দরদাম করতে থাকেন, এ সময় বলা হয় ১ হাত করলে ১৫ শত টাকা,২ হাত করলে ডিসকাউন্টে একদাম ২৫ শত টাকা। এর এক টাকা কমেও হবে না। অত:পর অনেক অনুনয় বিনয় করে ২৫ শত টাকা ঘুস দিলে তবেই সরকারী গ্যাজ,ব্যান্ডেজ ও চকপাউডার দ্বারা কোন প্রকার দায়সারাগোছে ২ রোগীর হাতে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়।
আমগাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙে যায় ১০ বছরের একটি শিশুর। ড্রেসিং করতে এক দিন পরপর যাত্রাবাড়ী থেকে শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) আসতে হয় তাকে। বিনা মূল্যে ড্রেসিং সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও শিশুটির পরিবারকে প্রতিবার ২০০ টাকা করে খরচ করতে হয়।
পঙ্গু হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সব রোগীকে পদে পদে টাকা গুনতে হয়। টাকা নেওয়ার অভিযোগ মূলত হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়, আয়াদের বিরুদ্ধে। সেবা গ্রহীতারা বলেন, যেসব সেবা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা, অর্থ খরচ না করলে এর সামান্যটুকুও মেলে না।
সিনিয়র স্টাফ নার্স, ওয়ার্ড বয়রা একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় এমনটা হচ্ছে বলে অভিযোগ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার।
২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ৭টি এবং কেবিন রয়েছে ১০টি। এছাড়াও ১টি ভি.আই.পি কেবিন ও ১০টি ফ্রি বেড রয়েছে। কেবিনের ভাড়া ১,০০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত এবং ওয়ার্র্ডের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এসি ও নন এসি ওয়ার্ড ও কেবিনের মান অনুসারে ভাড়ার পার্থক্য হয়। কেবিন/ওয়ার্ডে সিট পাওয়ার জন্য জরুরী বিভাগে যোগাযোগ করতে হয়। এখান থেকে ডাক্তার রোগীকে ভর্র্তির পরামর্শ দিলে বেড খালি খাকা সাপেক্ষে রোগী ভর্তি করা হয়। তবে জরুরি হলে মেঝেতে চাদর বিছিয়েও রোগীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
গতকাল সোমবার হাসপাতালটির বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, যেসব রোগী ড্রেসিং করেছেন, প্লাস্টার করেছেন তাঁদের প্রায় সবাইকে এ জন্য টাকা খরচ করতে হয়েছে। ড্রেসিংয়ের জন্য ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত রোগীর কাছ থেকে নিতে দেখা গেছে। আর প্লাস্টারের ধরনের ওপর নির্র্ভর করে টাকার পরিমাণ। তবে সে ক্ষেত্রেও ৪০০ টাকার কম নয়।
সিঁড়ি থেকে পড়ে পায়ে আঘাত পেয়ে মিরপুরের কালশী থেকে হাসপাতালে এসেছেন এক নারী। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে প্লাস্টারের জন্য প্লাস্টার কক্ষে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত নার্স এই সেবার জন্য তাঁর কাছে ৬০০ টাকা চান। তবে ওই নারীর অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকায় রফা হয়।
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক মাহফুজুল হক তালুকদার বলেন, পঙ্গু হাসপাতালে সব সেবাই বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। কেবল এক্স-রে, প্যাথোলজি এবং ফিজিওথেরাপির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ড্রেসিং ও প্লাস্টারের কাজটি মূলত সিনিয়র স্টাফ নার্সদের দায়িত্ব। তবে সেখানে আয়া-ওয়ার্ড বয় এমনকি সুইপারকেও কাজ করতে দেখা যায়। গতকাল ড্রেসিংয়ের কক্ষে ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স মান্নান ও মঞ্জুরুল। আর প্লাস্টার কক্ষে দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র স্টাফ নার্স বাসারুল আলম, মোতালেব হোসেন ও এম এ কাইয়ুম। তাঁরা সবাই দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা। এর মধ্যে এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়া এবং রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ বেশি।
এম এ কাইয়ুম বলেন, ‘হাসপাতালে দীর্ঘদিন থেকে প্লাস্টারের সাপ্লাই নাই। আমরা রোগীদের হেল্পটেল্প কইরা ব্যবস্থা কইরা দিই। তাদের কেউ খুশি হইয়া, কেউ জোর করে পকেটে ১০০-২০০ টাকা ঢুকাইয়া দেয়।’ হাসপাতালের নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি কাইয়ুম বলেন, ‘প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে বয়দের এখানে কাজ করতে পাঠান। এতে বাধা দেওয়ায় তাঁদের আমার ওপর ক্ষোভ।’
পুরোনো রোগীদের রেকর্ড রুমে গিয়ে নাম নিবন্ধন করে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে হয়। এতে কোনো টাকা নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও সেখানে রোগীপ্রতি ২০ টাকা করে নেয়। গতকাল সেখানে মহিউদ্দিন নামের ওয়ার্ড বয়কে টাকা নিতে দেখা গেছে। এখানে তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা কাজ করার কথা থাকলেও লোকবল না থাকায় দুজন ওয়ার্ড বয় দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে হাসপাতালের এক উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন বদলি না হওয়ায় সিনিয়র স্টাফ নার্স, আয়া ও ওয়ার্ড বয়দের দুর্নীতির সুযোগ অনেক বেড়েছে। এই স্টাফ নার্সদের কাছে রোগী এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনও অসহায়। তবে টাকা লেনদেনের বিষয়টি হাসপাতালের সবাই অবগত থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক মো. আবদুল গনি মোল্লাহ বলেন, বহির্বিভাগে রোগীর তুলনায় জায়গা খুব কম। এই সুযোগে কেউ হয়তো কিছু অনিয়ম করছে। যাচাই-বাছাই করে তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জরুরী বিভাগের ওটিতে টাকার খেলা
জরুরী বিভাগের পাশেই নীচতলায় বর্হিবিভাগেন অপারেশন থিয়েটার বা ওটি। এখানে চলছে এলাহী কান্ড। রোগীর অভিভাবকদের ব্ল্যাকমেল করে দফায় দফায় টাকা,ওষুধ, স্যালাইন, সেলাই করার সুতা এমন কি গ্যাজ, ব্যান্ডেজ পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে ওয়ার্ডবয় , নার্স ও বহিরাগত দালালরা। রোগীদের অপারেশন থিয়েটার বা ওটিতে ঢুকানোর পর ঘন্টায় ঘন্টায় একেকজন ওযার্ডবয়,নার্স বা বহিরাগত এসে অভিভাবকদের কাছে একেকজন একেক রকম ওষুধের স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এটা এখনি নিয়ে আসুন আপনার রোগীর লাগবে। ডাক্তার স্যার লিখে দিয়েছেন। এভাবে রোগীর অভিবাবকদের ব্ল্যাকমেলিং করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে টাউট শ্রেণী। অথচ: এদের উতখাত করার কোন পদক্ষেপই নিচ্ছেন না হাসপাতাল প্রশাসন। অন্য দিকে ওটি থেকে রোগী বের করে এনে অ্জারভেশন ওয়ার্ডে রাখতেও দিতে হচ্ছে বখশিস। ৪/৫ শত টাকা বখশিস ন্ দিলে তারা ওটি থেকে রোগী বেন কনছে না। আবার অবজারভেশন ওয়ার্ড থেকে রোগীতে বেডে স্থানান্তর করতে গেলেও ওয়ার্ডবয় বা আয়াদের দিতে হচ্ছে ২/৩ শত টাকা। রোগীকে ৭/৮ তলায় ওয়ার্ডে স্থানান্তর করতে গেলেও ট্রলিম্যানদের দিতে হচ্ছে ২/৩ শত টাকা। ভর্তি রোগীদের বেড পেতেও গুনতে হচ্ছে ৫শত থেকে ১ হাজার টাকা। না হলে বেড মিণছে না। বেশির ভাগ রোগীই তাই ফ্লোরে পাটি বিছিয়ে অমানবিক দিনরাত কাটাচ্ছেন। এখাবে থাকতে যেয়ে অনেক রোগীর অভিভাবক আবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ডাক্তারদের অমানবিক ঘুসকান্ড!
এই হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের কিছু স্ার্জন ও সহযোগী সার্জন রোগীদের ওপর মড়ার ওপর খাড়ার ঘা দিচ্ছেন নিয়মিত। তারা সরকারী বেতন ভাতা পেলেও ঘুস ছাড়া কোন রোগীকে অপারেশন করেন না। আর এই ঘুস নেওয়ার পদ্ধতিটাও একদম ভিন্ন। যেহেতু কারা সরাসরি ঘুস নিতে পারছেন না,তাই একটু বাকা পথ অবলম্বন করছেন। যেমন: অপারেশন করার আগে রোগীর অভিভাবকদের হাতে সার্জিক্যলি ইন্সট্রুমেন্টের তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি কোন দোকান থেকে কিনতে হবে সেটিও লিখে দিচ্ছেন। ফলে ওই দোকানদার ১ টাকার মাল ৩ টাকা হারে বিল কষে নিছেন। পরবর্তীতে অতি: নেওয়া ২ টাকা সার্জন কমিশন বাবদ নিজের পকেটে তুলছেন। এছাড়াও অপারেশন চলাকালে সার্জনের একান্ত লোক কাছে রেখে নানা অজুহাত দেখিয়ে ৫/৬ হাজার টাকা আদায় করছেন। এই টাকার কোন রশিদ বা ভাউচারও দিচ্ছেন না।

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে পঙ্গু হাসপাতাল
তিন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতাল। তারা রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে হাসপাতালে নানা ধরনের অপকর্ম চালায়। এক্স-রে, সিটিস্ক্যান, এমআরআই নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত এই সিন্ডিকেট।
কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সতর্ক করলেও তাতে কর্ণপাত করেনি। উল্টো তাদেরই হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শ করে নিজেদের অপকর্ম চালিয়ে যেত। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া এই তিনজনকে শাস্তিমূলক বদলি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। কিন্তু তারা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে বদলির ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে। ফলে হাসপাতালে এখন তাদের প্রভাবই বহাল। আগের চেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের তিনজন টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট করে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পায় কর্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। তারপর হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ডা. তড়িৎ কুমার সাহাকে সভাপতি করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাদের শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। সেখানে বলা হয়- জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) মো. হুমায়ুন কবির, মো. হেলালুল মোজাম্মেল ও মো. আবদুল বারেককে যথাক্রমে বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু যোগদানের তারিখ শেষ হওয়ার আগেই সিন্ডিকেটের এ তিন সদস্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে বদলির ওপর স্থগিতাদেশ এনে জমা দেন।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গনি মোল্লা বলেন, সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ তিনজন দীর্ঘদিন নানা অপকর্ম করে আসছে। তদন্তে সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাদের বদলি করা হল। কিন্তু প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে এ অপরাধীরা স্থগিতাদেশ পেয়েছে। এখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটির সদস্য এবং হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাকসুদা বেগম ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম তাদের মতামত প্রদান করেন। যেখানে এ তিন টেকনোলজিস্টের ভয়ংকর চরিত্র উন্মোচিত হয়। তারা বলেন, গত ১০ বছরে হুমায়ুন কবির সম্পর্কে রোগীদের কাছ থেকে অনেক অভিযোগ এসেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে এক্স-রে করার বিনিময়ে সরকারি ফি’র বাইরে রোগীপ্রতি অতিরিক্ত ১০০-২০০ টাকা আদায় এবং রোগীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি।

একপর্যায়ে হুমায়ুন কবির সিটিস্ক্যান করার দাবি জানালে তাকে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে বিনা রশিদে রোগীদের সিটিস্ক্যান শুরু করে। এ অপরাধে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে হুমায়ুনের দুর্নীতি প্রমাণের জন্য হাসপাতাল পরিচালকের মৌখিক নির্দেশে ইমার্জেন্সি এক্স-রে রুমে দুটি অনলাইন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। কিন্তু এতে হুমায়ুন ক্ষুব্ধ হন ও চিকিৎসকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। রাতে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে রাখেন। এমনকি বিভাগীয় প্রধানের নির্দেশ অমান্য করে বহিরাগতদের দিয়ে হাসপাতালে ডিউটি করাতে থাকেন। যারা রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে তাকে সাহায্য করে। তিনি বিভাগীয় প্রধানের কোনো নির্দেশ মানতেন না, ঠিকমতো ডিউটি রোস্টার না মেনে নিজের মর্জিমাফিক কাজ করতেন। কোনো অনিয়মে বাধা দিলেই কটূক্তি করতেন। এমনকি নানা হুমকি দিতেন। ডিউটিতে থাকাবস্থায় হাসপাতালে থেকেই নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এমনকি মদ্যপ অবস্থায় হাসপাতালে চলাফেরা করতেন এবং সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন।

হেলাল মোজাদ্দেদ সম্পর্কে তদন্ত কমিটি বলেন, হেলাল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে কর্মরত ছিলেন। সেখানে এক্স-রে, সিটিস্ক্যান ও এমআরআই বন্ধ থাকায় এবং হুমায়ুন কবিরের আত্মীয় হওয়ায় নিটোরে নবসৃষ্ট পদে বদলি হয়ে আসেন। সিটিস্ক্যান, এমআরআই রোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন না। সিটিস্ক্যান ও এমআরআই রোগীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতেন। এসব অনৈতিক কাজে হাসপাতালের বাইরের লোক ব্যবহার করতেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়াই তাদের কথোপকথন রেকর্ড করে ব্ল্যাকমেইল করতেন। বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্তর ছবি তুলে হাসপাতালে বাইরের লোকজনের কাছে পাচার করতেন। এমনকি কর্মকর্তাদের অজ্ঞাতে তাদের কম্পিউটার ব্যবহার করতেন।
আব্দুল বারেক সম্পর্কে তদন্ত কমিটির বক্তব্য-বারেক এক্স-রে ও সিটিস্ক্যান করে রোগীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন- এটা তিনি নিজেই বহুবার স্বীকার করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, কারও নির্দেশনাই মানতেন না। এমনকি কোভিড-১৯ নির্ধারিত হাসপাতালে তাকে প্রেষণে পাঠানো হলেও কোয়ারেন্টিন সময়ে অধিপত্য বজায় রাখতে এই বিভাগে আসতেন।
তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া তথ্যে দেখা যায়, মো. হুমায়ুন কবির পঙ্গু হাসপাতালে যোগদান করেছেন ২০০৮ সালে, আবদুল বারেক ২০০৩ সালে এবং মো. হেলালুল মোজাদ্দেদ যোগদান করেছেন চলতি বছরের শুরুর দিকে। এই তিনজনই দাবি করেছেন তারা এমআরআই এবং সিটিস্ক্যান করেন না, তাই রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি তারা এক্স-রে করেও রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তারা হাসপাতালে বাইরের লোক দিয়ে কাজ করোনার কথা স্বীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম বলেন, তদন্তে তিনজন টেকনোলজিস্টের অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিদফতর থেকে তাদের বদলি করা হয়েছে। কিন্তু তারা বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান না করে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থেকে স্থগিতাদেশ এনেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের স্থগিতাদেশ বলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এমনকি এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়। হাসান ইমাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালক, অধ্যক্ষ, অধ্যাপক, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত অর্ধশত চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। তারা সবাই বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করেছেন; কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কোনো নির্দেশ দিলেই তারা আদেশ অমান্য করে। এতে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বিনষ্ট হয়।
বহিরাগত দালালদের অসীম দৌরাত্ম
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) এখনো বহিরাগত দালালদের হাতে জিম্মি বলে দাবি করেছেন রোগীরা। সাধারন রোগীদের অভিযোগ, যেকোনো রিপোর্ট করতে গেলে দালালরা বিভিন্নভাবে বিরক্ত করে।
রোগীদের অভিযোগ, দালালরা জানায় পঙ্গু হাসপাতালের টেস্ট রিপোর্ট ভালো হয় না। এজন্য তারা আশেপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে টানাটানি করে। এসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর সঙ্গে থাকা লোকজন যদি সতর্ক হয়, তাহলে দালালদের খপ্পর থেকে কিছুটা রেহাই পাবেন তারা।
রোগীদের অভিযোগ, জরুরি ও বহির্বিভাগের গেট থেকেই ভর্তি পর্যন্ত শুরু হয় রোগীদের ভোগানিাত। রবিবার (২৮ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে ঘুরে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ সময় আজগর আলী নামের এক রোগী বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে একটি ভবনের ছাদ থেকে পড়ে হাত ভেঙে যায়। এরপর এখানে ডা. শাহিন সুলতানাকে দেখাই। আমার হাত ঠিক হতে তিনি আমাকে ৬ মাস সময় বেধে দেন। আমি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। পরে ডা. রিয়াজের সহকারীর খপ্পরে পড়ে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পঙ্গু থেকে ছাড়পত্র নিই। আমি পরে বুঝতে পারলাম প্রতারণার শিকার হয়েছি। এরপর আমি আবার ডা. শাহিন সুলতানাকে দেখাই এবং বর্তমান ভালো আছি।’
মটরসাইকেলে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গাজিপুর জেলার কাশিমপুর এলাকা থেকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসছেন সাগর হোসেন। এ সময় সাগর হোসেনের বাবা বিপুল আলী বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে আসার সময় গেটের বাইরে থেকে রাজু নামের এক দালাল আমাদের বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে রোগী নিয়ে যেতে, আমরা বলেছি পঙ্গু হাসপাতালেই রোগীর চিকিৎসা করব।’
মহাখালী সাততলা বস্তি থেকে রফিক নামের এক ব্যক্তি রোগী নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, দালাল-সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি পঙ্গু হাসপাতাল, দেখার কেউ নেই। এখানে স্টাফরা রোগীদের সহযোগিতা করে না।’
এ সময় শ্যামপুরের তাসলিমা নামের এক নারী অভিযোগ করে বলেন, রোগী ভর্ভির সময় নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ধাপে ধাপে টাকা দিতে হয় অন্যথায় স্টাফ বা ট্রলিম্যানরা রোগী ধরতে চায় না।
ফরিদপুর থেকে রোগী নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ফাতেমা বেগম নামের আরেক নারী। তিনি অভিযোগ করেন, রোগীর প্রয়োজনে সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না ডাক্তার, নার্স, ওষুধসহ সব কিছুই বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। প্রাইভেট হাসপাতালের মতো পঙ্গু হাসপাতাল। তার মধ্যে তো আছেই দালালদের দৌরাত্ম্য।
তিনি বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল) যেন এখনো দালাল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।’
জানা যায়, বখশিশ ছাড়া কোনো কাজ হচ্ছে না পঙ্গু হাসপাতালে। চিকিৎসা সেবা প্রদানের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকলেও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চরম ভোগাস্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে কেবিন, ওয়ার্ড, প্যাথলজি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটারসহ বহির্বিভাগ পর্যন্ত এ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পঙ্গু হাসপাতালে টাকা ছাড়া কোনো রোগী ওয়ার্ডবয় ও আয়াদের কাছ থেকে ন্যূনতম সেবা পান না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সিন্ডিকেটের কাছে ডাক্তাররা পর্যন্ত অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। হাসপাতালের একাধিক নার্স ও ওয়ার্ডবয় জানিয়েছেন, দালালদের আগে দেখলে চেনা যেত। বর্তমানে তারা সিন্ডিকেটের যোগসাজশে দর্শনার্থীদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে, দেখলে চেনার কোনো উপায় নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালকের সহকারী মোহাম্মাদ জাহিদ ঢাকাপ্রকাশ-কে বলেন, সিন্ডিকেটের চোখের ইশারায় রোগীদের টার্গেট করে। যেসব রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বহন করার সামর্থ্য আছে সেসব রোগী এবং তাদের স্বজনদের কাছে গিয়ে দালালরা পঙ্গু হাসপাতাল সম্পর্কে বিভিন্ন খারাপ ধারণা দিতে থাকে। তারা ওই সব রোগীদের অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। সবাই সর্তক হলে এসব কমে আসবে। আমাদের সেবার মান বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল গনি মোল্লাহ বলেন, ‘আগের মতো এখন আর পঙ্গু হাসপাতালে দালাল চক্রের সদস্যরা রোগীদের বিরক্ত করতে পারে না। আমরা পরিচ্ছন্ন পঙ্গু হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে কিছু কিছু সময় রোগীদের ভুলের কারণে তারা ভাঙা হাত-পা দ্রত ভালো করার আশার দালালের খপ্পরে পড়ে, ও অন্য প্রইভেট হাসপাতালে চলে যায়। পরে তারা বিভিন্ন ভোগান্তির শিকার হয় এবং পঙ্গু হাসপাতালের দোষ দেয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের মানুষ ঘোরাঘুরি করে। দেশের প্রতিটা সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, রোগীরা যদি এসব বিষয়ে একটু সর্তক হয় তাহলে দালালের খপ্পড়ে থেকে তারা দূরে থাকবে।’