১২:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৮০ লাখ মাদকসেবী: প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকা মাদকের কেনাবেচা: মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের বড় বাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ!

প্রতিনিধির নাম:

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাজার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন অন্যতম। প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে মাদক কারবারিরা। তবু থেমে নেই নিত্য নতুন মাদকের আমদানি।

চীন ও থাইল্যান্ডের কড়া অবস্থানের কারণে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা সরবরাহ বন্ধ হয়েছে দেশ দুটিতে। এরপর থেকেই মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের বড় বাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারও ইয়াবা ও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে টান পড়ে সরবরাহে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বাজারে দেখা যাচ্ছে নতুন মাদকের দৌরাত্ম। মাদক কারবারিদের এসব চক্র এখন লেনদেনও করছে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইনে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিছুই তাদের নজরদারির বাইরে নেই। যারা নতুন মাদক নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নতুন চার মাদক
ইয়াবার বিরুদ্ধে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন হলো কারবারিরা সুবিধা করতে পারছিল না। এজন্য তারা চেষ্টায় ছিল নতুন মাদক বাজারে আনার।

এখন বলা যায় মাদকের ট্রানজিশন পিরিয়ডের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে তারা। বিশ্বের আরও অনেক দেশেই এমনটা দেখা যায়। একটি মাদক এক বা দুই দশক চলে। এরপর কৌশলগত কারণেই নতুন কিছু নিয়ে আসে মাদকচক্র। এ তালিকায় সদ্য যোগ হয়েছে- ম্যাজিক মাশরুম, ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন (ডিএমটি), লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি), ক্রিস্টাল মেথ বা আইস বা মেথামফেটামিন ও এস্কাফ সিরাপ। এর প্রতিটিই বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যারা এসব মাদক নিয়ে গ্রেফতার হয়েছে, দেখা গেছে তারা সবাই সচ্ছল পরিবারের সন্তান।

২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমে আইস পিলসহ এক মাদকব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর ও ঝিগাতলায় অভিযান চালিয়ে আইস তৈরির ল্যাবেরও সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঝিগাতলার একটি বাসার বেজমেন্টে এই ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল।

এরপর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এক নাইজেরিয়ান নাগরিককেও আইসসহ গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। বিভিন্ন কেমিক্যালের বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করা এই মাদক যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সাধারণত ধনী রাষ্ট্রের মাদকসেবীরা এটি গ্রহণ করে। এক গ্রামের দাম ৭-১০ হাজার টাকা।

মেথামফেটামিনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ অবস্থা আইস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইয়াবা তৈরিতেও এর ব্যবহার আছে। ইয়াবা আসক্তদের শরীরে একসময় অনেকগুলো ইয়াবা সেবনের পরেও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তখন তারা সরাসরি মেথামফেটামিন গ্রহণ করে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আইস উদ্ধার হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ সাল থেকেই দেশে এ মাদকের ব্যবহার বেড়েছে।

গত ৬ জুলাই রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে ‘ম্যাজিক মাশরুম’সহ দুই যুবককে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ম্যাজিক মাশরুমের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বারে ২৪টি স্লাইস থাকে। গ্রেফতার দু’জন হলেন- নাগিব হাসান অর্নব (২৫) ও তাইফুর রশিদ জাহিদ (২৩)। দুজনে বাংলাদেশে এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়ালেখা করেছেন। অর্নব ২০১৪ সালে কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষে সেখানে কর্মরত আছেন। সে-ই কানাডা থেকে এই ম্যাজিক মাশরুম বাংলাদেশে নিয়ে আসে। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ড্রাগটি কেক ও চকলেট মিক্স অবস্থায় সেবন করা হয়। এ ছাড়া পাউডার ও ক্যাপসুল হিসেবেও পাওয়া যায়। এটি ব্যবহারে সেবনকারীর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমনকি কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফ দেয়।

গত ৩০ মে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভয়ংকর মাদক এলএসডিসহ (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) চারজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হঠাৎ কেন ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলায় চালাল, সেটা তদন্ত করতে গিয়েই আমরা মাদকটির সন্ধান পাই।’ অত্যন্ত দামি এ মাদক ঢাকায় অনলাইনে বিক্রি করতো ১৫টি গ্রুপ। যারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।

তবে এর আগে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই মহাখালী থেকে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এই মাদকের সন্ধান পায়। তারাও কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল।

গত জুনেই দেশে উদ্ধার হয় ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার লাভ রোডে অভিযান চালিয়ে ডিএমটিসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। তাদের কাছ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম ডিএমটি উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাব দাবি করেছে, দেশে প্রথমবারের মতো ডিএমটি উদ্ধার হলো। এলএসডির চেয়ে ভয়ংকর এই মাদক। এটা সেবনে হ্যালুসিনেশন হয়। সেবনের ৩০-৪০ মিনিট গভীর হ্যালুসিনেশন হয়। এতে সেবনকারী দ্রুত কল্পনার জগতে চলে যায়। এতে ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। সেবনকারী মারাও যেতে পারে।

র‌্যাব-২ এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, এলএসডির মতো ডিএমটিওসেবীরাও উচ্চবিত্ত। তারা নিজেরাই বিদেশ গিয়ে এটি নিয়ে আসে। কেউ পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমেও নিয়ে আসে। মাদকটি দামী হওয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি।

নতুন মাদকে আগ্রহ কেন?

দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক গ্রহণের ফলে আসক্তদের দেহে এসবের প্রতিক্রিয়া কমে আসে। তারা উদ্দীপনার জন্য নতুন কিছু খুঁজতে থাকে। ব্যক্তিজীবনে হতাশা ও ব্যর্থতা ঢাকতেও শক্তিশালী মাদক খোঁজে তারা। মাদককারবারিরা তখন চাহিদা বুঝে নতুন মাদক সরবরাহ করে।

২০১৮ সালের মে মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। ইয়াবার বিরুদ্ধে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসারসহ সকল বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতিতে প্রায় দুই বছর টানা অভিযান চালায়।

জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের মাদকসেবীরা একই সময় বিভিন্ন মাদক গ্রহণ করে। যে ইয়াবা খায়, সে গাঁজাও গ্রহণ করে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মাদকের বাজার বেশ বড়। এটা ধরে রাখতে একের পর এক কৌশল খাটাবেই কারবারিরা। ভৌগলিক কারণেও তাদের কাছে বাংলাদেশ প্রিয়। অভিযানের কারণে মাদক প্রবেশ হয়তো কমেছে, তাবে মাদককারবারিরা বসে নেই। তারা নতুন মাদক নিয়ে ভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।’

৫০ বছরে মাদক বদলেছে পাঁচবার

শতবছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রচলন ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অব্যাহত আছে এ ধারা। তবে গত ৫০ বছরে অন্তত পাঁচবার মাদকের ধরন পরিবর্তন করেছে সেবীরা। আফিম-গাঁজা দিয়ে শুরু হয়ে যা এখন ঠেকেছে ম্যাজিক মাশরুম-এ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গবেষকরা বলছেন, মাদক পরিবর্তনের এ ধারা কয়েকটি কারণে ঘটে। একসময় হেরোইন ও ফেনসিডিলের চাহিদা ছিল বেশি, পরে ওই বাজার দখল করে ইয়াবা। ইয়াবা থেকেও এখন অন্য মাদকে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

প্রতি দশকে নতুন মাদক

বাংলাদেশে গড়ে এক দশক পরপর মাদকের ধরন ও বাজার বদলেছে। তবে ইয়াবা ও গাঁজার রাজত্ব আছে আগের মতোই।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে ধূমপানের পাশাপাশি গাঁজা, আফিম ও দেশি মদের বেশ দৌরাত্ম ছিল। ১৯৮৪ সালের দিকে মাদকসেবীরা মৃতসঞ্জীবনী, গাঁজা, ও বিভিন্ন ধরনের তরল নেশাদ্রব্য পান শুরু করে।

ছয় বছর পর ১৯৯০ সালে ভারত থেকে আসতে শুরু করে ফেনসিডিল। নব্বই দশক থেকে শুরু হয় হেরোইন, গাঁজা ও মদ। ২০০০ সালে এসব মাদকের পাশাপাশি যোগ হয় নানা ধরনের ইনজেকশন। তখন সরাসরি শরীরে মাদক পুশ করে নেশার জগতে বুঁদ হয়ে থাকতো সেবীরা। ২০০৫ সালে আসে ভয়ংকর ইয়াবা। গত দেড়যুগে এটি ছড়িয়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো। গ্রামগঞ্জেও এখন ইয়াবার রমরমা বাজার।

২০০৮ সালের দিকে আঠাজাতীয় রাসায়নিকের ঘ্রাণ নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। মূলত বস্তি ও পথশিশুদের মধ্যে এ মাদকের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এর মাঝে ২০১৯ সালে দেশে আসে আইস ও এলএসডি। আর এ বছর সন্ধান পাওয়া যায় ম্যাজিক মাশরুম ও ডিএমটি নামের আরও ভয়ানক মাদকের।

আন্তর্জাতিক সংস্থা যা বলছে

গত ২৪ জুন মাদক নিয়ে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি)। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে মাদক সেবনকারী মানুষের সংখ্যা ১১ শতাংশ বাড়বে।

এই সময় আফ্রিকাসহ অনুন্নত দেশগুলোতে মাদক সেবন বাড়বে ৪০ শতাংশ। আর উন্নত দেশে কমবে ১ শতাংশ। তবে মাদক বাজারে করোনার প্রভাবও পড়তে পারে। অন্যদিকে এই সময়ে ইন্টারনেট ভিত্তিক মাদক বিক্রিও বেড়েছে।

সংস্থাটির দাবি, ইন্টারনেটের মাধ্যমেই এখন বিশ্বে সাড়ে ৩১ কোটি ডলারের মাদক বিক্রি হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে বৈধ ওষুধকেও মাদকে রূপান্তর করে ব্যবহারের মাত্রা বেড়েছে।

সংস্থাটি দাবি করেছে বাংলাদেশে যত মাদক ঢুকছে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। ৯০ শতাংশই চলছে অবাধে। এই হিসাবে গতবছর দেশে ৩০ কোটি ইয়াবা বড়ি বিক্রি হয়েছে। গড়ে প্রতি বড়ি সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা হিসাবে যার বাজারমূল্য সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের বেশিরভাগই চলে গেছে ইয়াবার মূল উৎসস্থল মিয়ানমারে।

গবেষণা বলছে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন মাদকের বাজার আছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার।

তবে উন্নয়ন সংস্থা মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘মাদকসেবীরা একটি না পেলে আরেকটি নেবে। আবার সাপ্লায়ার যখন যা সাপ্লাই দিতে পারবে তারা সেটা নিতেও বাধ্য। ইয়াবা যেসব কাঁচামাল দিয়ে তৈরি, সেগুলাও সরাসরি ইয়াবাসেবীরা পাচ্ছে। আইস তার মধ্যে অন্যতম। ইয়াবা তৈরি হয় এমফিটামিন দিয়ে। আইস হচ্ছে সরাসরি এমফিটামিন। এটি সামান্য পরিমাণে গ্রহণ করলেই শরীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।’

নতুন মাদকের টার্গেট ঢাকা

দেশে চার ধরনের নতুন মাদক পাওয়া গেছে গত দুই বছরে। এগুলো এখনও ঢাকার বাইরে ছড়ায়নি। এমনই ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

নতুন মাদক সংশ্লিষ্ট যারা গ্রেফতার হয়েছে তারা ঢাকা মহানগর এলাকাতেই ধরা পড়েছে। তবে ‘আইস’ বা ‘ক্রিস্টাল মেথ’ এর একটি বড় চালান টেকনাফ থেকে জব্দ করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সেটিও ঢাকার জন্য আনা হচ্ছিল। ঢাকামুখী এসব মাদক কারবারিদের আটকানো না গেলে ইয়াবার মতো নতুন মাদকও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি টিম মোহাম্মদপুর থেকে আইসসহ রাকিব উদ্দিন নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছিল। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিগাতলার ৭/এ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাসার নিচতলায় অভিযান চালিয়ে একটি মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়।

ওই ঘটনায় হাসিব মোহাম্মদ মোয়াম্মার রশিদ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। মোয়াম্মার মালয়েশিয়া থেকে লেখাপড়া করে ঢাকায় নিজেদের ভবনে ওই গবেষণাগার গড়ে তুলেছিল। সেখানে আইস বানাতো সে। এর কয়েক মাস পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এক নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেফতার করে অধিদফতরের সদস্যরা।

২০২০ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তার পাঁচ সহযোগীসহ ছয়জনকে ৬০০ গ্রাম আইসসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর থেকে র‌্যাব, পুলিশ ও অধিদফতরের অভিযানে আইসের একাধিক চালান উদ্ধার করা হয়।

‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথ ইয়াবার চেয়েও শক্তিশালী। ইয়াবায় মিথাইল অ্যামফিটামিন ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে। আইস বা ক্রিস্টাল মেথ মানে শতভাগ মিথাইল অ্যামফিটামিন।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে তাতে দেখেছি, আইস ও এলএসডি বেশ ব্যয়বহুল মাদক। ধনী পরিবারের সন্তানরা এসব সেবন করে। প্রতিবার আইস সেবন করতে তাদের খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকা। এটি সবার পক্ষে কেনা সম্ভব না।’

দুই বছরে ঢাকায় গ্রেফতার ৩৫
গত দুই বছরে নতুন চার ধরনের মাদকসহ ৩৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও ডিএমপি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর গত দুই বছরে মোট তিন কেজি আইস আটক করেছে। গ্রেফতার করেছে ছয়জনকে। ২০২১ সালের মার্চে দুই কেজি আইসসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে টেকনাফের হ্নীলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাব জানিয়েছে, গত দুই বছরে তারা পাঁচটি অভিযানে আইস, এলএসডি, ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুমসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম আইসসহ ১১ জন, এলএসডি’র ৪০টি ব্লট ও ৬০০ মিলিগ্রাম ডিএমটিসহ চারজন এবং ম্যাজিক মাশরুমের ৫টি বার ও ১২০টি স্লাইসসহ দুজন গ্রেফতার হয়। এসব চালান উদ্ধার করা হয় ঢাকা থেকে।

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। নতুন মাদকের বিষয়েও তৎপর রয়েছি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে নতুন মাদকসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছি।’

অপরদিকে, ২০২০ ও ২০২১ সালে নতুন মাদকসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করে ডিএমপি। এসময় প্রায় পৌনে এক কেজি আইস ও ২ গ্রাম ১২ মিলিগ্রাম এলএসডি উদ্ধার করা হয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে নতুন মাদকের বিষয়ে অনেক তথ্য পেয়েছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

২০২০ সালে ডিএমপিতে ১২ হাজার ৬১৯টি মাদকের মামলা হয়েছে। এসময় গ্রেফতার হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫৫ জন। ২০২১ সালের প্রথম ছয়মাসে ডিএমপিতে মাদক মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৪৪৩টি। গ্রেফতার হয়েছে ১০ হাজার ৫৫০ জন।

‘মাদক কারবারিরা বিভিন্ন মাদক দিয়ে সাপ্লাই চেইন ধরে রাখার চেষ্টা করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তৎপর থাকতে হবে।’ এমনটা উল্লেখ করে মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘মাদক কারবারিরা বসে থাকে না। এক মাদকে বাধা পেলে অন্য মাদক দিয়ে বাজার ধরার চেষ্টা করে।’

দেশে মাদকাসক্ত কত?
২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এক সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে বলা হয়, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। এর মধ্যে ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী মাদকাসক্ত আছে প্রায় ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার। ৭ বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর আছে ৫৬ হাজারের কিছু বেশি।

২০১৩ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি) তাদের রিজিওনাল অফিস থেকে বাংলাদেশের মাদক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাদকসেবীর সংখ্যা ৪০ লাখ ৬০ হাজার বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশে মাদক গ্রহণের প্রবণতা ও ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করলে গত ৮ বছরে এই সংখ্যার সঙ্গে নতুন করে আরও ৫-৭ লাখ যুক্ত হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেই হিসাবে দেশে এখন মাদকাসক্ত আছে প্রায় ৫০ লাখ।

অবশ্য এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে একমত নয় দেশের এনজিওগুলো। তারা দাবি করছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭৫ লাখেরও বেশি। মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে ৭৫ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। যাদের ৮০ শতাংশই তরুণ। তারা একাধিক মাদকে আসক্ত।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কোনও পরিসংখ্যানকেই অস্বীকার করছে না। কারণ এ নিয়ে তাদের নিজস্ব কোনও গবেষণা নেই। তারা সর্বোচ্চ সংখ্যাটাকে বিবেচনা করেই বার্ষিক পরিকল্পনা সাজায়।

কত প্রকার মাদক আছে দেশে?

দেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৭ ধরনের মাদক। নিয়মিত সেবনের তালিকায় ১৮ ধরনের মাদকই বেশি। সবচেয়ে বেশি সেবন হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। নতুন আইন করেও কমানো যায়নি মাদকের ব্যাপকতা। অভিযান চালিয়ে সরবরাহ চ্যানেল কিছু সময়ের জন্য আটকানো গেলেও আসক্তরা মাদক পাচ্ছে নিয়মিতই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে মাদকের প্রসার না কমলে বাংলাদেশেও এর ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের একযোগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

২৭ রকম মাদক

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন চার ধরনের মাদকসহ বাংলাদেশে ২৭ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে। এগুলো হলো- ম্যাজিক মাশরুম, ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন (ডিএমটি), লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি), ক্রিস্টাল মেথ বা আইস বা মেথামফিটামিন, এস্কাফ সিরাপ, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথিডিন, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি. জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), মরফিন, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈধ ড্রাগ একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে মাদক। এসবও সেবন হচ্ছে দেদার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) মজিবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘আমাদের দেশের মাদকসেবীদের একাধিক মাদক গ্রহণের ঝোঁক রয়েছে। যে মাদকটা সে নিয়মিত গ্রহণ করে, সেটি না পেলে হাতের কাছে যা পায় তা-ই নিয়ে নেয়। মাদকসেবীরা নিজেরাও বৈধ ড্রাগের অপব্যবহার করছে। আমারা দেখেছি দেশে ৮ থেকে ১০ ধরনের মাদক নেওয়ার প্রবণতা বেশি। বাকিগুলো খুব একটা দেখা যায় না।’

আন্তর্জাতিক চক্রের নজর কেন বাংলাদেশে?

মাদকাসক্তি বিষয়ক গবেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এমদাদুল হক বলেন, ‘ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলের মাঝে পড়েছে। এটি একটি ‘স্যান্ডউইচ’ অবস্থা। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলে আছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড, গোল্ডেন ওয়েজ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দেশ ভারত এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অঞ্চলে আছে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানে তাই বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এ চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মাদক কারবারিদের যোগাযোগটাও এ কারণে শক্তিশালী। শ্রীলঙ্কায় এর আগে মাদক নিয়ে বাংলাদেশি নারী-পুরুষ গ্রেফতার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ইয়াবা মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে। বিমানবন্দরে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে ও হচ্ছে।’

অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে এই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে। কারণ তাদের দেশে মাদকের ভয়াবহতা থাকলে প্রভাব বাংলাদেশে পড়বেই।’

লেনদেন করছে ভার্চুয়াল মুদ্রায়

মাদক কেনাবেচার বড় বাজার এখন অনলাইন। বাংলাদেশেও দেদার চলছে এ পদ্ধতি। সম্প্রতি এমনই প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক বাজার রয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। যে কারণে আন্তর্জাতিক চক্রের নজর এখানে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জানিয়েছেন, ‘তারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর।’

বিটকয়েনে অর্থপাচার
গত ৬ জুলাই রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ ও বিদেশি মদসহ দুই যুবককে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ম্যাজিক মাশরুমের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া নাগিব হাসান অর্নব (২৫) থাকতো কানাডায়। সে এই মাদক বাংলাদেশে নিয়ে আসে। ‘চকোলেট কেক’ হিসেবে কুরিয়ারের মাধ্যমে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে এ মাদক বাংলাদেশে আনে সে। মাদকের টাকা পরিশোধ করতো দেশে অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনে।

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীরা এখন বেশ চালাক। তাদের লেনদেনগুলো ধরার সুযোগ কম। নতুন যেসব মাদক পাওয়া গেছে সেগুলো আনা হতো বিদেশ থেকে। বিট কয়েন, পেপালসহ অনলাইন নানা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে চলতো লেনদেন।’

মাদকের বাজার ৬০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশে মাদকের বাজার কত তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে মাদকসেবী ও মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান দিয়ে তা অনুমান করা যায়। দেশের ৭৬ লাখ মাদকসেবী গড়ে দিনে ৩৫০-৪০০ টাকার মাদক সেবন করে। এ ছাড়াও বছরজুড়ে উদ্ধারকৃত মোট মাদকের ৯ গুণ বাজারে আছে বলে বিবেচনা করা হয়।

গবেষক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, ‘মাদক যা ধরা পড়ে বাজারে তার ৯ গুণ বেশি আছে বলে ধরা হয়। এটাই আন্তর্জাতিক প্যারামিটার।’

এ ছাড়াও পাইকারি ও খুচরা বাজারে ৫-৬ ধাপে মাদক বিক্রি হওয়ার পর সেবীদের হাতে পৌঁছায়। এসব কিছু মাথায় রেখে হিসাব করে বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে বাংলাদেশের মাদকের বাজার প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার।

২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং বর্তমানে পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘দেশে ৮০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। তারা প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি টাকা মাদকের পেছনে খরচ করে।’

মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় মাদক কেনাবেচায়। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা চিকিৎসা, পুর্নবাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খরচ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এসবের ব্যয়।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বার্ষিক যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে দেখা গেছে, ২০২০ সালে অধিদফতর, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩১৭টি ইয়াবা বড়ি, ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৭৭ বোতল ফেনসিডিল, ৫০ হাজার ৭৮ কেজি গাঁজা, প্রায় ৭২ কেজি আফিম এবং প্রায় ৪ কেজি কোকেন উদ্ধার করে।

ওই বছর এসব ঘটনায় ৮৫ হাজার ৭১৮টি মামলায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপডেট সময় ১০:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ অগাস্ট ২০২১
১৮৫ বার পড়া হয়েছে

৮০ লাখ মাদকসেবী: প্রতিদিন ২৫০ কোটি টাকা মাদকের কেনাবেচা: মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের বড় বাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ!

আপডেট সময় ১০:০২:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ অগাস্ট ২০২১

রোস্তম মল্লিক

বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাজার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন অন্যতম। প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে মাদক কারবারিরা। তবু থেমে নেই নিত্য নতুন মাদকের আমদানি।

চীন ও থাইল্যান্ডের কড়া অবস্থানের কারণে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা সরবরাহ বন্ধ হয়েছে দেশ দুটিতে। এরপর থেকেই মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের বড় বাজার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারও ইয়াবা ও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে টান পড়ে সরবরাহে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বাজারে দেখা যাচ্ছে নতুন মাদকের দৌরাত্ম। মাদক কারবারিদের এসব চক্র এখন লেনদেনও করছে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইনে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, কিছুই তাদের নজরদারির বাইরে নেই। যারা নতুন মাদক নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নতুন চার মাদক
ইয়াবার বিরুদ্ধে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন হলো কারবারিরা সুবিধা করতে পারছিল না। এজন্য তারা চেষ্টায় ছিল নতুন মাদক বাজারে আনার।

এখন বলা যায় মাদকের ট্রানজিশন পিরিয়ডের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে তারা। বিশ্বের আরও অনেক দেশেই এমনটা দেখা যায়। একটি মাদক এক বা দুই দশক চলে। এরপর কৌশলগত কারণেই নতুন কিছু নিয়ে আসে মাদকচক্র। এ তালিকায় সদ্য যোগ হয়েছে- ম্যাজিক মাশরুম, ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন (ডিএমটি), লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি), ক্রিস্টাল মেথ বা আইস বা মেথামফেটামিন ও এস্কাফ সিরাপ। এর প্রতিটিই বেশ ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যারা এসব মাদক নিয়ে গ্রেফতার হয়েছে, দেখা গেছে তারা সবাই সচ্ছল পরিবারের সন্তান।

২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমে আইস পিলসহ এক মাদকব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদপুর ও ঝিগাতলায় অভিযান চালিয়ে আইস তৈরির ল্যাবেরও সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঝিগাতলার একটি বাসার বেজমেন্টে এই ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল।

এরপর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এক নাইজেরিয়ান নাগরিককেও আইসসহ গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। বিভিন্ন কেমিক্যালের বিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করা এই মাদক যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সাধারণত ধনী রাষ্ট্রের মাদকসেবীরা এটি গ্রহণ করে। এক গ্রামের দাম ৭-১০ হাজার টাকা।

মেথামফেটামিনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ অবস্থা আইস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইয়াবা তৈরিতেও এর ব্যবহার আছে। ইয়াবা আসক্তদের শরীরে একসময় অনেকগুলো ইয়াবা সেবনের পরেও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তখন তারা সরাসরি মেথামফেটামিন গ্রহণ করে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আইস উদ্ধার হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ সাল থেকেই দেশে এ মাদকের ব্যবহার বেড়েছে।

গত ৬ জুলাই রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে ‘ম্যাজিক মাশরুম’সহ দুই যুবককে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ম্যাজিক মাশরুমের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বারে ২৪টি স্লাইস থাকে। গ্রেফতার দু’জন হলেন- নাগিব হাসান অর্নব (২৫) ও তাইফুর রশিদ জাহিদ (২৩)। দুজনে বাংলাদেশে এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়ালেখা করেছেন। অর্নব ২০১৪ সালে কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষে সেখানে কর্মরত আছেন। সে-ই কানাডা থেকে এই ম্যাজিক মাশরুম বাংলাদেশে নিয়ে আসে। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ড্রাগটি কেক ও চকলেট মিক্স অবস্থায় সেবন করা হয়। এ ছাড়া পাউডার ও ক্যাপসুল হিসেবেও পাওয়া যায়। এটি ব্যবহারে সেবনকারীর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমনকি কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফ দেয়।

গত ৩০ মে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ভয়ংকর মাদক এলএসডিসহ (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) চারজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হঠাৎ কেন ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলায় চালাল, সেটা তদন্ত করতে গিয়েই আমরা মাদকটির সন্ধান পাই।’ অত্যন্ত দামি এ মাদক ঢাকায় অনলাইনে বিক্রি করতো ১৫টি গ্রুপ। যারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান।

তবে এর আগে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই মহাখালী থেকে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এই মাদকের সন্ধান পায়। তারাও কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল।

গত জুনেই দেশে উদ্ধার হয় ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন বা ডিএমটি। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার লাভ রোডে অভিযান চালিয়ে ডিএমটিসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। তাদের কাছ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম ডিএমটি উদ্ধার করা হয়।

র‍্যাব দাবি করেছে, দেশে প্রথমবারের মতো ডিএমটি উদ্ধার হলো। এলএসডির চেয়ে ভয়ংকর এই মাদক। এটা সেবনে হ্যালুসিনেশন হয়। সেবনের ৩০-৪০ মিনিট গভীর হ্যালুসিনেশন হয়। এতে সেবনকারী দ্রুত কল্পনার জগতে চলে যায়। এতে ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। সেবনকারী মারাও যেতে পারে।

র‌্যাব-২ এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, এলএসডির মতো ডিএমটিওসেবীরাও উচ্চবিত্ত। তারা নিজেরাই বিদেশ গিয়ে এটি নিয়ে আসে। কেউ পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমেও নিয়ে আসে। মাদকটি দামী হওয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি।

নতুন মাদকে আগ্রহ কেন?

দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক গ্রহণের ফলে আসক্তদের দেহে এসবের প্রতিক্রিয়া কমে আসে। তারা উদ্দীপনার জন্য নতুন কিছু খুঁজতে থাকে। ব্যক্তিজীবনে হতাশা ও ব্যর্থতা ঢাকতেও শক্তিশালী মাদক খোঁজে তারা। মাদককারবারিরা তখন চাহিদা বুঝে নতুন মাদক সরবরাহ করে।

২০১৮ সালের মে মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। ইয়াবার বিরুদ্ধে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসারসহ সকল বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতিতে প্রায় দুই বছর টানা অভিযান চালায়।

জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশের মাদকসেবীরা একই সময় বিভিন্ন মাদক গ্রহণ করে। যে ইয়াবা খায়, সে গাঁজাও গ্রহণ করে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মাদকের বাজার বেশ বড়। এটা ধরে রাখতে একের পর এক কৌশল খাটাবেই কারবারিরা। ভৌগলিক কারণেও তাদের কাছে বাংলাদেশ প্রিয়। অভিযানের কারণে মাদক প্রবেশ হয়তো কমেছে, তাবে মাদককারবারিরা বসে নেই। তারা নতুন মাদক নিয়ে ভিন্ন উপায়ে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।’

৫০ বছরে মাদক বদলেছে পাঁচবার

শতবছর আগে থেকেই এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মাদকের প্রচলন ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অব্যাহত আছে এ ধারা। তবে গত ৫০ বছরে অন্তত পাঁচবার মাদকের ধরন পরিবর্তন করেছে সেবীরা। আফিম-গাঁজা দিয়ে শুরু হয়ে যা এখন ঠেকেছে ম্যাজিক মাশরুম-এ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গবেষকরা বলছেন, মাদক পরিবর্তনের এ ধারা কয়েকটি কারণে ঘটে। একসময় হেরোইন ও ফেনসিডিলের চাহিদা ছিল বেশি, পরে ওই বাজার দখল করে ইয়াবা। ইয়াবা থেকেও এখন অন্য মাদকে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে।

প্রতি দশকে নতুন মাদক

বাংলাদেশে গড়ে এক দশক পরপর মাদকের ধরন ও বাজার বদলেছে। তবে ইয়াবা ও গাঁজার রাজত্ব আছে আগের মতোই।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালে ধূমপানের পাশাপাশি গাঁজা, আফিম ও দেশি মদের বেশ দৌরাত্ম ছিল। ১৯৮৪ সালের দিকে মাদকসেবীরা মৃতসঞ্জীবনী, গাঁজা, ও বিভিন্ন ধরনের তরল নেশাদ্রব্য পান শুরু করে।

ছয় বছর পর ১৯৯০ সালে ভারত থেকে আসতে শুরু করে ফেনসিডিল। নব্বই দশক থেকে শুরু হয় হেরোইন, গাঁজা ও মদ। ২০০০ সালে এসব মাদকের পাশাপাশি যোগ হয় নানা ধরনের ইনজেকশন। তখন সরাসরি শরীরে মাদক পুশ করে নেশার জগতে বুঁদ হয়ে থাকতো সেবীরা। ২০০৫ সালে আসে ভয়ংকর ইয়াবা। গত দেড়যুগে এটি ছড়িয়েছে ব্যাঙের ছাতার মতো। গ্রামগঞ্জেও এখন ইয়াবার রমরমা বাজার।

২০০৮ সালের দিকে আঠাজাতীয় রাসায়নিকের ঘ্রাণ নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। মূলত বস্তি ও পথশিশুদের মধ্যে এ মাদকের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। এর মাঝে ২০১৯ সালে দেশে আসে আইস ও এলএসডি। আর এ বছর সন্ধান পাওয়া যায় ম্যাজিক মাশরুম ও ডিএমটি নামের আরও ভয়ানক মাদকের।

আন্তর্জাতিক সংস্থা যা বলছে

গত ২৪ জুন মাদক নিয়ে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (ইউএনওডিসি)। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে মাদক সেবনকারী মানুষের সংখ্যা ১১ শতাংশ বাড়বে।

এই সময় আফ্রিকাসহ অনুন্নত দেশগুলোতে মাদক সেবন বাড়বে ৪০ শতাংশ। আর উন্নত দেশে কমবে ১ শতাংশ। তবে মাদক বাজারে করোনার প্রভাবও পড়তে পারে। অন্যদিকে এই সময়ে ইন্টারনেট ভিত্তিক মাদক বিক্রিও বেড়েছে।

সংস্থাটির দাবি, ইন্টারনেটের মাধ্যমেই এখন বিশ্বে সাড়ে ৩১ কোটি ডলারের মাদক বিক্রি হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে বৈধ ওষুধকেও মাদকে রূপান্তর করে ব্যবহারের মাত্রা বেড়েছে।

সংস্থাটি দাবি করেছে বাংলাদেশে যত মাদক ঢুকছে তার মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। ৯০ শতাংশই চলছে অবাধে। এই হিসাবে গতবছর দেশে ৩০ কোটি ইয়াবা বড়ি বিক্রি হয়েছে। গড়ে প্রতি বড়ি সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা হিসাবে যার বাজারমূল্য সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের বেশিরভাগই চলে গেছে ইয়াবার মূল উৎসস্থল মিয়ানমারে।

গবেষণা বলছে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন মাদকের বাজার আছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার।

তবে উন্নয়ন সংস্থা মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘মাদকসেবীরা একটি না পেলে আরেকটি নেবে। আবার সাপ্লায়ার যখন যা সাপ্লাই দিতে পারবে তারা সেটা নিতেও বাধ্য। ইয়াবা যেসব কাঁচামাল দিয়ে তৈরি, সেগুলাও সরাসরি ইয়াবাসেবীরা পাচ্ছে। আইস তার মধ্যে অন্যতম। ইয়াবা তৈরি হয় এমফিটামিন দিয়ে। আইস হচ্ছে সরাসরি এমফিটামিন। এটি সামান্য পরিমাণে গ্রহণ করলেই শরীতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।’

নতুন মাদকের টার্গেট ঢাকা

দেশে চার ধরনের নতুন মাদক পাওয়া গেছে গত দুই বছরে। এগুলো এখনও ঢাকার বাইরে ছড়ায়নি। এমনই ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

নতুন মাদক সংশ্লিষ্ট যারা গ্রেফতার হয়েছে তারা ঢাকা মহানগর এলাকাতেই ধরা পড়েছে। তবে ‘আইস’ বা ‘ক্রিস্টাল মেথ’ এর একটি বড় চালান টেকনাফ থেকে জব্দ করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সেটিও ঢাকার জন্য আনা হচ্ছিল। ঢাকামুখী এসব মাদক কারবারিদের আটকানো না গেলে ইয়াবার মতো নতুন মাদকও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি টিম মোহাম্মদপুর থেকে আইসসহ রাকিব উদ্দিন নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছিল। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিগাতলার ৭/এ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাসার নিচতলায় অভিযান চালিয়ে একটি মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান পাওয়া যায়।

ওই ঘটনায় হাসিব মোহাম্মদ মোয়াম্মার রশিদ নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। মোয়াম্মার মালয়েশিয়া থেকে লেখাপড়া করে ঢাকায় নিজেদের ভবনে ওই গবেষণাগার গড়ে তুলেছিল। সেখানে আইস বানাতো সে। এর কয়েক মাস পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে এক নাইজেরিয়ান নাগরিককে গ্রেফতার করে অধিদফতরের সদস্যরা।

২০২০ সালের ৪ নভেম্বর রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তার পাঁচ সহযোগীসহ ছয়জনকে ৬০০ গ্রাম আইসসহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর থেকে র‌্যাব, পুলিশ ও অধিদফতরের অভিযানে আইসের একাধিক চালান উদ্ধার করা হয়।

‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথ ইয়াবার চেয়েও শক্তিশালী। ইয়াবায় মিথাইল অ্যামফিটামিন ব্যবহার করা হয় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে। আইস বা ক্রিস্টাল মেথ মানে শতভাগ মিথাইল অ্যামফিটামিন।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে তাতে দেখেছি, আইস ও এলএসডি বেশ ব্যয়বহুল মাদক। ধনী পরিবারের সন্তানরা এসব সেবন করে। প্রতিবার আইস সেবন করতে তাদের খরচ হয় ১০-১২ হাজার টাকা। এটি সবার পক্ষে কেনা সম্ভব না।’

দুই বছরে ঢাকায় গ্রেফতার ৩৫
গত দুই বছরে নতুন চার ধরনের মাদকসহ ৩৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও ডিএমপি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর গত দুই বছরে মোট তিন কেজি আইস আটক করেছে। গ্রেফতার করেছে ছয়জনকে। ২০২১ সালের মার্চে দুই কেজি আইসসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে টেকনাফের হ্নীলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাব জানিয়েছে, গত দুই বছরে তারা পাঁচটি অভিযানে আইস, এলএসডি, ডিএমটি ও ম্যাজিক মাশরুমসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে ৩ কেজি ২৭০ গ্রাম আইসসহ ১১ জন, এলএসডি’র ৪০টি ব্লট ও ৬০০ মিলিগ্রাম ডিএমটিসহ চারজন এবং ম্যাজিক মাশরুমের ৫টি বার ও ১২০টি স্লাইসসহ দুজন গ্রেফতার হয়। এসব চালান উদ্ধার করা হয় ঢাকা থেকে।

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। নতুন মাদকের বিষয়েও তৎপর রয়েছি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে নতুন মাদকসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছি।’

অপরদিকে, ২০২০ ও ২০২১ সালে নতুন মাদকসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করে ডিএমপি। এসময় প্রায় পৌনে এক কেজি আইস ও ২ গ্রাম ১২ মিলিগ্রাম এলএসডি উদ্ধার করা হয়।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে নতুন মাদকের বিষয়ে অনেক তথ্য পেয়েছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

২০২০ সালে ডিএমপিতে ১২ হাজার ৬১৯টি মাদকের মামলা হয়েছে। এসময় গ্রেফতার হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫৫ জন। ২০২১ সালের প্রথম ছয়মাসে ডিএমপিতে মাদক মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৪৪৩টি। গ্রেফতার হয়েছে ১০ হাজার ৫৫০ জন।

‘মাদক কারবারিরা বিভিন্ন মাদক দিয়ে সাপ্লাই চেইন ধরে রাখার চেষ্টা করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তৎপর থাকতে হবে।’ এমনটা উল্লেখ করে মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘মাদক কারবারিরা বসে থাকে না। এক মাদকে বাধা পেলে অন্য মাদক দিয়ে বাজার ধরার চেষ্টা করে।’

দেশে মাদকাসক্ত কত?
২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এক সমীক্ষা পরিচালনা করে। তাতে বলা হয়, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। এর মধ্যে ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী মাদকাসক্ত আছে প্রায় ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার। ৭ বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর আছে ৫৬ হাজারের কিছু বেশি।

২০১৩ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি) তাদের রিজিওনাল অফিস থেকে বাংলাদেশের মাদক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাদকসেবীর সংখ্যা ৪০ লাখ ৬০ হাজার বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশে মাদক গ্রহণের প্রবণতা ও ঊর্ধ্বগতি বিবেচনা করলে গত ৮ বছরে এই সংখ্যার সঙ্গে নতুন করে আরও ৫-৭ লাখ যুক্ত হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেই হিসাবে দেশে এখন মাদকাসক্ত আছে প্রায় ৫০ লাখ।

অবশ্য এ পরিসংখ্যানের সঙ্গে একমত নয় দেশের এনজিওগুলো। তারা দাবি করছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭৫ লাখেরও বেশি। মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে ৭৫ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। যাদের ৮০ শতাংশই তরুণ। তারা একাধিক মাদকে আসক্ত।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কোনও পরিসংখ্যানকেই অস্বীকার করছে না। কারণ এ নিয়ে তাদের নিজস্ব কোনও গবেষণা নেই। তারা সর্বোচ্চ সংখ্যাটাকে বিবেচনা করেই বার্ষিক পরিকল্পনা সাজায়।

কত প্রকার মাদক আছে দেশে?

দেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ২৭ ধরনের মাদক। নিয়মিত সেবনের তালিকায় ১৮ ধরনের মাদকই বেশি। সবচেয়ে বেশি সেবন হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। নতুন আইন করেও কমানো যায়নি মাদকের ব্যাপকতা। অভিযান চালিয়ে সরবরাহ চ্যানেল কিছু সময়ের জন্য আটকানো গেলেও আসক্তরা মাদক পাচ্ছে নিয়মিতই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে মাদকের প্রসার না কমলে বাংলাদেশেও এর ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের একযোগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

২৭ রকম মাদক

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন চার ধরনের মাদকসহ বাংলাদেশে ২৭ ধরনের মাদক উদ্ধার হয়েছে। এগুলো হলো- ম্যাজিক মাশরুম, ডায়মিথাইলট্রিপ্টামাইন (ডিএমটি), লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড (এলএসডি), ক্রিস্টাল মেথ বা আইস বা মেথামফিটামিন, এস্কাফ সিরাপ, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথিডিন, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি. জেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), মরফিন, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন।

এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈধ ড্রাগ একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে মাদক। এসবও সেবন হচ্ছে দেদার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) মজিবুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘আমাদের দেশের মাদকসেবীদের একাধিক মাদক গ্রহণের ঝোঁক রয়েছে। যে মাদকটা সে নিয়মিত গ্রহণ করে, সেটি না পেলে হাতের কাছে যা পায় তা-ই নিয়ে নেয়। মাদকসেবীরা নিজেরাও বৈধ ড্রাগের অপব্যবহার করছে। আমারা দেখেছি দেশে ৮ থেকে ১০ ধরনের মাদক নেওয়ার প্রবণতা বেশি। বাকিগুলো খুব একটা দেখা যায় না।’

আন্তর্জাতিক চক্রের নজর কেন বাংলাদেশে?

মাদকাসক্তি বিষয়ক গবেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এমদাদুল হক বলেন, ‘ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলের মাঝে পড়েছে। এটি একটি ‘স্যান্ডউইচ’ অবস্থা। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলে আছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড, গোল্ডেন ওয়েজ অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দেশ ভারত এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অঞ্চলে আছে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানে তাই বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এ চক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মাদক কারবারিদের যোগাযোগটাও এ কারণে শক্তিশালী। শ্রীলঙ্কায় এর আগে মাদক নিয়ে বাংলাদেশি নারী-পুরুষ গ্রেফতার হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ইয়াবা মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও পাঠানোর চেষ্টা হয়েছে। বিমানবন্দরে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে ও হচ্ছে।’

অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে এই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে। কারণ তাদের দেশে মাদকের ভয়াবহতা থাকলে প্রভাব বাংলাদেশে পড়বেই।’

লেনদেন করছে ভার্চুয়াল মুদ্রায়

মাদক কেনাবেচার বড় বাজার এখন অনলাইন। বাংলাদেশেও দেদার চলছে এ পদ্ধতি। সম্প্রতি এমনই প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বাংলাদেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদক বাজার রয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। যে কারণে আন্তর্জাতিক চক্রের নজর এখানে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জানিয়েছেন, ‘তারা এ ব্যাপারে যথেষ্ট তৎপর।’

বিটকয়েনে অর্থপাচার
গত ৬ জুলাই রাতে রাজধানীর হাতিরঝিলে অভিযান চালিয়ে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ ও বিদেশি মদসহ দুই যুবককে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ম্যাজিক মাশরুমের পাঁচটি বার উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া নাগিব হাসান অর্নব (২৫) থাকতো কানাডায়। সে এই মাদক বাংলাদেশে নিয়ে আসে। ‘চকোলেট কেক’ হিসেবে কুরিয়ারের মাধ্যমে অনলাইনে অর্ডার নিয়ে এ মাদক বাংলাদেশে আনে সে। মাদকের টাকা পরিশোধ করতো দেশে অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা বিটকয়েনে।

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীরা এখন বেশ চালাক। তাদের লেনদেনগুলো ধরার সুযোগ কম। নতুন যেসব মাদক পাওয়া গেছে সেগুলো আনা হতো বিদেশ থেকে। বিট কয়েন, পেপালসহ অনলাইন নানা পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে চলতো লেনদেন।’

মাদকের বাজার ৬০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশে মাদকের বাজার কত তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে মাদকসেবী ও মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান দিয়ে তা অনুমান করা যায়। দেশের ৭৬ লাখ মাদকসেবী গড়ে দিনে ৩৫০-৪০০ টাকার মাদক সেবন করে। এ ছাড়াও বছরজুড়ে উদ্ধারকৃত মোট মাদকের ৯ গুণ বাজারে আছে বলে বিবেচনা করা হয়।

গবেষক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, ‘মাদক যা ধরা পড়ে বাজারে তার ৯ গুণ বেশি আছে বলে ধরা হয়। এটাই আন্তর্জাতিক প্যারামিটার।’

এ ছাড়াও পাইকারি ও খুচরা বাজারে ৫-৬ ধাপে মাদক বিক্রি হওয়ার পর সেবীদের হাতে পৌঁছায়। এসব কিছু মাথায় রেখে হিসাব করে বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে বাংলাদেশের মাদকের বাজার প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার।

২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং বর্তমানে পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, ‘দেশে ৮০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। তারা প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি টাকা মাদকের পেছনে খরচ করে।’

মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ডা. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় মাদক কেনাবেচায়। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা চিকিৎসা, পুর্নবাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খরচ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এসবের ব্যয়।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বার্ষিক যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে দেখা গেছে, ২০২০ সালে অধিদফতর, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৩ কোটি ৮৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩১৭টি ইয়াবা বড়ি, ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ১৭৭ বোতল ফেনসিডিল, ৫০ হাজার ৭৮ কেজি গাঁজা, প্রায় ৭২ কেজি আফিম এবং প্রায় ৪ কেজি কোকেন উদ্ধার করে।

ওই বছর এসব ঘটনায় ৮৫ হাজার ৭১৮টি মামলায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।